ব্যাংকিং ও এফডিআর

বাংলাদেশ ব্যাংক সিটি গ্রুপকে দিচ্ছে ১,৭০০ কোটি টাকার উদ্ধার ঋণ, খেলাপি অবস্থা উপেক্ষা করে

২৬ অক্টোবর, ২০২৬4 মিনিটের পড়া
বাংলাদেশ ব্যাংক সিটি গ্রুপকে দিচ্ছে ১,৭০০ কোটি টাকার উদ্ধার ঋণ, খেলাপি অবস্থা উপেক্ষা করে

বাংলাদেশ ব্যাংক আটটি ব্যাংককে সিটি গ্রুপকে নতুন ঋণ দেওয়ার পরিকল্পনায় সায় দিয়েছে, যদিও গ্রুপটি খেলাপি, কারণ এটি চিনি, ভোজ্যতেল আর অন্যান্য নিত্যপণ্যের বড় সরবরাহকারী। সব ঋণদাতা এতে একমত নয়, আর নতুন ঋণ গেলেও সিটি গ্রুপ খাতায় খেলাপি হিসেবেই থাকছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক প্রাথমিকভাবে সম্মত হয়েছে, আটটি বেসরকারি ব্যাংককে সিটি গ্রুপকে প্রায় ১,৭০০ কোটি টাকার নতুন ঋণ ও এলসি সুবিধা দেওয়ার অনুমতি দিতে, যদিও দেশের এই বড় শিল্পগোষ্ঠীটি ৪৮টি ঋণদাতার কাছে প্রায় ২৬,০০০ কোটি টাকার ঋণে খেলাপি অবস্থায় আছে। ২৫ অক্টোবর বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের সভাপতিত্বে এই পরিকল্পনা ঠিক হয়, যেখানে ব্যাংক কোম্পানি আইনের ১২১ ধারায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ক্ষমতা ব্যবহার করে ঋণদাতা ব্যাংকগুলোকে খেলাপিদের নতুন ঋণ দেওয়া নিষেধের নিয়ম থেকে ছাড় দেওয়া হবে।

  • সিটি ব্যাংক দেবে ৩০০ কোটি টাকা, আর বাকি সাতটি ব্যাংক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক, ডাচ-বাংলা ব্যাংক, সাউথইস্ট ব্যাংক, ট্রাস্ট ব্যাংক, এনসিসি ব্যাংক আর পূবালী ব্যাংক প্রতিটি দেবে ২০০ কোটি টাকা।
  • এই সুবিধা মাত্র পাঁচটি সিটি গ্রুপ প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রযোজ্য, যা এখনো ঋণদাতাদের বেছে নিতে হবে, আর এই পাঁচটির জন্য এলসির অনুমোদন লাগবে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে আলাদাভাবে।
  • ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, সিটি গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে আছে বাংলাদেশের চিনির সরবরাহের প্রায় ৩০ শতাংশ, ভোজ্যতেলের ৪০ শতাংশ আর অন্যান্য জরুরি পণ্যের ৩০ শতাংশ।
  • ব্যাংক এশিয়া, ব্র্যাক ব্যাংক আর ইস্টার্ন ব্যাংক এই উদ্ধার প্রক্রিয়ায় যোগ না দিয়ে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার পক্ষে ছিল বলে জানা গেছে।

কাগজে খেলাপি, বাস্তবে লাইফলাইন

বাংলাদেশ ব্যাংক চুপিসারে ঋণদাতাদের অনুরোধ করেছিল সিটি গ্রুপের ঋণ গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত না করতে, যাতে গ্রুপটি তার আর্থিক সমস্যা সমাধানের সময় পায়। সেই সময়সীমা এখন পার হয়ে গেছে। এইচএসবিসি তার সিটি গ্রুপের ঋণ ইতিমধ্যে খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত করেছে, আর বাকি ঋণদাতাদেরও অক্টোবরে নিয়মিত নিয়মে তা করতে হবে, যার ফলে তাদের ঋণের বিপরীতে প্রভিশন রাখতে হবে। নতুন ঋণের এই পরিকল্পনা সেই শ্রেণীবিভাগ বদলায় না। বরং এটি একটা ব্যতিক্রম তৈরি করে, যাতে আটটি ব্যাংক এমন একজন ঋণগ্রহীতাকে নতুন ঋণ দিতে পারে, যে খাতায় এখনো খেলাপি হিসেবেই আছে।

ব্যাংকপ্রস্তাবিত নতুন ঋণ
সিটি ব্যাংক৩০০ কোটি টাকা
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক২০০ কোটি টাকা
প্রাইম ব্যাংক২০০ কোটি টাকা
ডাচ-বাংলা ব্যাংক২০০ কোটি টাকা
সাউথইস্ট ব্যাংক২০০ কোটি টাকা
ট্রাস্ট ব্যাংক২০০ কোটি টাকা
এনসিসি ব্যাংক২০০ কোটি টাকা
পূবালী ব্যাংক২০০ কোটি টাকা

নিয়ন্ত্রকরা কেন একজন খেলাপিকে আড়াল দিচ্ছেন

ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে সিটি গ্রুপের বাজার অংশীদারি এত বড় যে আকস্মিক অর্থ সরবরাহ বন্ধ হলে ভোক্তাদের জন্য তা বিপজ্জনক হতে পারে। নাম প্রকাশ না করা এক ব্যাংক প্রধান নির্বাহী বলেন, আকস্মিক সরবরাহ সংকট হলে ব্যবসায়ীরা তার সুযোগ নিয়ে দাম বাড়িয়ে দিতে পারেন, যাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে দরিদ্র পরিবারগুলো। বাংলাদেশ ব্যাংক এটাও মনে করে বলে জানা গেছে, গ্রুপটির বৈদেশিক মুদ্রায় কেনা যন্ত্রপাতি একটা জাতীয় সম্পদ, যা মাঝপথে ফেলে রাখার চেয়ে রক্ষা করা ভালো।

"কারখানা চালু রাখতেই হবে," বলেন সিটি গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. হাসান, যিনি গ্রুপের আর্থিক সংকটের মূল কারণ হিসেবে বৈদেশিক মুদ্রা ক্ষতি আর ব্যাংক সহায়তা কমে যাওয়ার কথা বলেছেন।

সিটি গ্রুপের সমস্যা এ বছরের চেয়েও পুরনো। ২০২৩ সালে প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ফজলুর রহমানের মৃত্যুর পর গ্রুপটি একীভূত নেতৃত্ব হারায়, ঠিক তখনই যখন বাংলাদেশের ব্যাংক খাত নিজেই মূলধন সংকট আর একত্রীকরণের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, ফলে অনেক ঋণদাতা গ্রুপটিকে চলতি মূলধন দিতে অক্ষম হয়ে পড়ে। গ্রুপের দাবি, ২০২২ সাল থেকে তাদের বৈদেশিক মুদ্রায় ক্ষতি ২,৫০০ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে, আর টাকার অবমূল্যায়নে তাদের আমদানি সক্ষমতা প্রায় ৯০০ মিলিয়ন ডলার কমে গেছে।

ব্যাংকাররা সবাই একমত নন

এই উদ্ধার পরিকল্পনায় সব ঋণদাতা স্বস্তিতে নেই। মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান পরিকল্পনায় যোগ দিলেও গ্রুপটির রেকর্ডের পক্ষে কথা বলেছেন।

"সিটি গ্রুপ আগে কখনো খেলাপি হয়নি আর তাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগও ছিল না," বলেন মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান।

অন্য ঋণদাতারা একেবারে বিপরীত মত দিয়েছেন। ব্যাংক এশিয়া, ব্র্যাক ব্যাংক আর ইস্টার্ন ব্যাংক পিএলসি উদ্ধার প্রক্রিয়া থেকে সরে এসে আইনি ব্যবস্থা নিয়ে টাকা ফেরত চাইতে চেয়েছিল বলে জানা গেছে, যদিও তিনটি ব্যাংককেই অক্টোবরের সভায় ডাকা হয়েছিল আর থেকে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করা হয়েছিল। এই বিভক্তি একটা বড় প্রশ্নের দিকেই ইঙ্গিত করে, যারা এখনো ঋণ দিচ্ছে তারা ধরে নিচ্ছে সিটি গ্রুপের কারখানা সচল রাখা একটা আনুষ্ঠানিক পতনের চেয়ে কম খরচের, আর যারা আইনি পথে যেতে চায় তারা বিপরীতটা মনে করছে।

আপনার জন্য এর মানে কী

আপনি যদি চিনি, ভোজ্যতেল বা সিটি গ্রুপ সংশ্লিষ্ট অন্য নিত্যপণ্য কেনেন, এই পরিকল্পনার তাৎক্ষণিক লক্ষ্য হলো আকস্মিক সরবরাহ সংকটে দাম বেড়ে যাওয়ার বদলে এসব পণ্য স্থিতিশীল দামে দোকানে থাকা নিশ্চিত করা। আপনি যদি এই আট ব্যাংকের কোনোটিতে অ্যাকাউন্ট বা জমা রাখেন, তাহলে জেনে রাখা ভালো, নিয়ন্ত্রকের অনুমোদন থাকলেও একজন খেলাপি ঋণগ্রহীতাকে নতুন ঋণ দেওয়া বাস্তব ঝুঁকি বহন করে, আর সিটি গ্রুপের বিদ্যমান ঋণের বিপরীতে প্রভিশনের প্রয়োজনীয়তা নতুন ঋণের পারফরম্যান্স যা হোক না কেন, এই বছর ওই ব্যাংকগুলোর ঘোষিত মুনাফার ওপর চাপ তৈরি করতে পারে। যারা ঝুঁকির চেয়ে নিরাপত্তাকে প্রাধান্য দিতে চান, তারা নতুন জমা রাখার আগে সাইটের এফডিআর রেট তুলনা টুল দিয়ে বিভিন্ন ব্যাংকের বর্তমান আমানতের হার দেখে নেওয়া যায়।

মন্তব্য

    এখনো কোনো মন্তব্য নেই — প্রথম মন্তব্যটি করুন।

মন্তব্য করতে সাইন ইন করুন

এরপর পড়ুন

ব্যাংকগুলো একের পর এক যুক্ত হচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংকের ২,০০০ কোটি টাকার ফ্রোজেন ফুড তহবিলে

বাংলাদেশ ব্যাংকের ২,০০০ কোটি টাকার ফ্রোজেন ফুড রপ্তানি তহবিলে নভেম্বরের শুরু থেকে এক সপ্তাহের মধ্যেই চারটি ব্যাংক যুক্ত হয়েছে। চিংড়ি, মাছ ও অন্যান্য হিমায়িত খাদ্যপণ্যের উৎপাদক ও রপ্তানিকারকদের জন্য এই তহবিল থেকে সর্বোচ্চ ৭ শতাংশ সুবিধাজনক সুদে ঋণ দেওয়া হবে। মার্কেন্টাইল ব্যাংক, এনআরবিসি ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক এবং কমিউনিটি ব্যাংক ইতিমধ্যে চুক্তিতে সই করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ায় নতুন ক্রেতা খুঁজতে হিমশিম খাচ্ছেন রপ্তানিকারকরা, এমন সময়েই এই উদ্যোগ এল।

মাত্র ৭ শতাংশ ব্যবহার হওয়ার পর বাংলাদেশ ব্যাংক তার ২০,০০০ কোটি টাকার কারখানা পুনরুজ্জীবন স্কিমে অর্থায়নের ক্রম উল্টে দিল

বাংলাদেশ ব্যাংক তার ২০,০০০ কোটি টাকার কারখানা পুনরুজ্জীবন স্কিমের নিয়ম নতুন করে লিখেছে, পাঁচ মাস পর যখন দেখা গেছে এর মাত্র ৭ শতাংশ অর্থ ঋণগ্রহীতাদের কাছে পৌঁছেছে। এখন ব্যাংকগুলোকে আগে নিজস্ব তহবিল থেকে ঋণ দিতে হবে এবং পরে ফেরত চাইতে হবে, যা মূল নকশার বিপরীত, সঙ্গে যোগ হয়েছে নতুন নাম, বোর্ড পর্যায়ের অনুমোদনের শর্ত এবং প্রতারণাবিরোধী ঘোষণা। এই পরিবর্তনগুলো বলে দেয়, নগদ প্রবাহ সংকটে বন্ধ হওয়া কারখানা আবার চালু করার প্রচেষ্টায় বাংলাদেশের এখনও কতটা পথ বাকি।

ইসলামী ব্যাংক রেকর্ড লোকসানের পর মূলধন পাঁচ গুণ বাড়িয়ে টাকা ১০,০০০ কোটিতে নেওয়ার পরিকল্পনা

ইসলামী ব্যাংকের বোর্ড টাকা ২,০০০ কোটি থেকে টাকা ১০,০০০ কোটিতে অনুমোদিত মূলধন পাঁচ গুণ বাড়ানোর পরিকল্পনা অনুমোদন করেছে, জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরে টাকা ১,৯৭০ কোটি লোকসান প্রকাশের একদিন পরেই, যা ব্যাংকটির সাম্প্রতিক বছরগুলোর সবচেয়ে বাজে প্রান্তিক ফল। নতুন শেয়ার ইস্যু করার আগে এখনও বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন এবং একটি অসাধারণ সাধারণ সভায় শেয়ারহোল্ডারদের সম্মতি লাগবে। ঘোষণার দিন শেয়ারের দাম কমে টাকা ২১.২০ এ নেমেছে, সপ্তাহের শুরুতে টাকা ২০ এর নিচে নামা দরপতনের ধারা আরও বাড়িয়ে। ব্যাংক বলছে বড় লিগ্যাসি ঋণে সংযুক্ত পক্ষের অর্থ আত্মসাতের কারণে হওয়া লোকসানের পর ব্যালেন্স শিট পুনর্গঠনের বৃহত্তর চেষ্টার অংশ এই উচ্চতর মূলধন সীমা।