বৈদেশিক মুদ্রা ও রেমিট্যান্স

টাকার মান টাকা১২৪ ছুঁতেই আবার ডলার বিক্রি করল বাংলাদেশ ব্যাংক, এই অর্থবছরে দ্বিতীয় হস্তক্ষেপ

২১ অক্টোবর, ২০২৬5 মিনিটের পড়া
টাকার মান টাকা১২৪ ছুঁতেই আবার ডলার বিক্রি করল বাংলাদেশ ব্যাংক, এই অর্থবছরে দ্বিতীয় হস্তক্ষেপ

২০ অক্টোবর ডলারের দাম টাকা১২৪ ছুঁয়ে ফেলার উপক্রম হওয়ার পর বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংকগুলোর কাছে ২ কোটি ডলার বিক্রি করেছে, এই অর্থবছরে এটাই দ্বিতীয় খোলা বাজার হস্তক্ষেপ। আমদানি বিল বাড়ছে, এলসি ৫৩ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চে উঠেছে, আর পাঁচ দিনের দুর্গাপূজার ছুটি সামনে, এর মধ্যেই এই পদক্ষেপ এসেছে। সেপ্টেম্বরের শেষে কিছুটা কমে যাওয়ার পর মোট রিজার্ভ আবার বেড়ে ৩৬.৩৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা কেন্দ্রীয় ব্যাংককে হস্তক্ষেপ চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ দিচ্ছে। আমদানিকারক আর সঞ্চয়কারী, দুই পক্ষের জন্যই এই ছোট বিক্রি বলে দেয় বাজারের সহ্যশক্তি কতটা কমে এসেছে।

২০ অক্টোবর বাংলাদেশ ব্যাংক বাজারে নেমে ব্যাংকগুলোর কাছে ২ কোটি ডলার বিক্রি করেছে, প্রতি ডলার ১২৩.৬৫ টাকা দরে। এই অর্থবছরে এটাই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দ্বিতীয়বার খোলা বাজারে ডলার বিক্রি। এর ঠিক আগের দিনই ডলারের দাম মনস্তাত্ত্বিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ টাকা১২৪ ছুঁয়ে ফেলার উপক্রম হয়েছিল, যে সীমাটা কেন্দ্রীয় ব্যাংক গত কয়েক সপ্তাহ ধরে নিঃশব্দে আটকে রাখার চেষ্টা করছে।

৩৬ বিলিয়ন ডলারের বেশি রিজার্ভের তুলনায় এই পরিমাণ আসলে খুবই ছোট। কিন্তু সময়টা অনেক কিছু বলে দেয়। পাঁচ দিনের দুর্গাপূজার ছুটি শুরু হওয়ার ঠিক আগে এই বিক্রি হয়েছে, যখন আমদানিকারকরা দ্রুত বিল মেটাতে ব্যস্ত আর জ্বালানি খাতের বকেয়া পরিশোধ ছুটির পরে জমে থাকার কথা, আর গ্রীষ্মের পর থেকে আমদানির চাহিদাও হু হু করে বাড়ছে।

  • ২০ অক্টোবর বাংলাদেশ ব্যাংক টাকা১২৩.৬৫ দরে ২ কোটি ডলার বিক্রি করে, এর আগে ১৪ সেপ্টেম্বর টাকা১২২.৮০ দরে ১১৫ লাখ ডলার বিক্রি করেছিল।
  • দুই দফা হস্তক্ষেপের মধ্যে ডলারের দাম প্রায় ৮৫ পয়সা বেড়েছে, গত এক সপ্তাহে দিনে গড়ে প্রায় ১০ পয়সা করে।
  • সেপ্টেম্বরে খোলা এলসির পরিমাণ ৮ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে, গত ৫৩ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ মাসিক হিসাব।
  • ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত মোট রিজার্ভ ছিল ৩৬.৩৯ বিলিয়ন ডলার, সেপ্টেম্বরের শেষে ৩৬.১৪ বিলিয়নে নেমে যাওয়ার পর তা আবার বেড়েছে।

২০ অক্টোবর আসলে কী হলো

রোববার মানি এক্সচেঞ্জ হাউজ থেকে ব্যাংকগুলোর ডলার কেনার দর টাকা১২৩.৬০-এ উঠে যাওয়ার পর দিনভর তা বাড়তেই থাকে, শেষ পর্যন্ত টাকা১২৩.৭০ ছুঁয়ে যায়। এরপরই বাংলাদেশ ব্যাংক রিজার্ভ থেকে ২ কোটি ডলার ছাড়ে। ব্যাংকগুলো এলসি মেটাতে আর রেমিট্যান্সের ডলার কিনতে টাকা১২৩.৭০ থেকে টাকা১২৩.৮০ দরে লেনদেন করছিল, আর কেন্দ্রীয় ব্যাংক মনে করেছে সরকারি দর আর বাজার দরের ফারাক এখন হস্তক্ষেপ করার মতো বড় হয়ে গেছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক শীর্ষ কর্মকর্তা সাংবাদিকদের বলেছেন, এই বিক্রি একরকম বার্তাও ছিল, শুধু সমাধান নয়, বাজারকে জানিয়ে দেওয়া যে দাম বাড়তে থাকলে আরও রিজার্ভ ছাড়া হবে। তা সত্ত্বেও দাম কিছুটা বেড়েছে, কারণ দৈনিক লেনদেনের তুলনায় ২ কোটি ডলার খুব বেশি নয়। এর আগে বাংলাদেশ ব্যাংক এভাবে ডলার বিক্রি করেছিল ১৪ সেপ্টেম্বর, তখন টাকা১২২.৮০ দরে ১১৫ লাখ ডলার ছেড়েছিল। মাত্র এক মাসের মধ্যে দুই হস্তক্ষেপের মাঝে ৮৫ পয়সার এই ফারাকই স্পষ্ট প্রমাণ যে রেমিট্যান্স ভালো থাকলেও ডলারের চাহিদা সরবরাহের চেয়ে এগিয়ে যাচ্ছে।

বার চার্টে দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ২০ সেপ্টেম্বর ৩৬.৩০ বিলিয়ন ডলার, ২৯ সেপ্টেম্বর ৩৬.১৪ বিলিয়ন ডলার এবং ১৭ অক্টোবর ৩৬.৩৯ বিলিয়ন ডলার
চার্ট: বিডি ফাইন্যান্সিয়াল রিভিউ, ঢাকা ট্রিবিউন ও ডেইলি সান থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে।

কেন ডলারের চাহিদা সরবরাহকে ছাপিয়ে যাচ্ছে

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা দুটো কারণের কথা বলছেন, আর দুটোই একই দিকে চাপ দিচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার কারণে জ্বালানি আর সারের দাম বেড়ে গেছে, তাই আগের মতোই পরিমাণ আমদানি করতে এখন বেশি ডলার লাগছে। এই অর্থবছরের জুলাই-আগস্টে পণ্য আমদানি আগের বছরের তুলনায় ১২ শতাংশের বেশি বেড়ে ১২.২০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যার ফলে এই দুই মাসে বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৩.৮২ বিলিয়ন ডলারে। সেপ্টেম্বরে খোলা এলসির পরিমাণ ৮ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে, গত ৫৩ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ, যা বলে দেয় ব্যবসায়ীরা দীর্ঘ মন্থর সময় পেরিয়ে এখন মজুদ বাড়াচ্ছে আর নতুন অর্ডার দিচ্ছে।

দ্বিতীয় কারণটা মৌসুমি। দুর্গাপূজার ছুটিতে ২০ থেকে ২২ অক্টোবর দেশজুড়ে ব্যাংক বন্ধ ছিল, আর ব্যাংকগুলো চাইছিল যাতে তাদের নস্ট্রো হিসাবে যথেষ্ট ডলার থাকে, যাতে ছুটির সময় জমে থাকা দায় মেটানো যায়। পেট্রোবাংলা আর বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের মতো রাষ্ট্রীয় জ্বালানি আমদানিকারকদেরও ব্যাংক খোলার পর বড় অঙ্কের বকেয়া মেটাতে হবে, যা ছুটির আগের এই তাড়াহুড়োয় আরও চাপ যুক্ত করেছে। একজন শীর্ষ বেসরকারি ব্যাংক কর্মকর্তা বলেছেন, ঠিক এই ক্যালেন্ডার চাপের কারণেই ব্যাংকগুলো মানি এক্সচেঞ্জ থেকে আরও বেশি দামে ডলার কিনছিল।

সেপ্টেম্বরের হস্তক্ষেপের সঙ্গে তুলনা

তারিখবিক্রি হওয়া পরিমাণদর
১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬১১৫ লাখ ডলারটাকা১২২.৮০
২০ অক্টোবর, ২০২৬২ কোটি ডলারটাকা১২৩.৬৫

সেপ্টেম্বর থেকে অক্টোবরের মধ্যে বিক্রির পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে, কিন্তু তারপরও দাম ৮৫ পয়সা বেড়েছে, যা নিজেই অনেক কিছু বলে দেয়। ২ কোটি ডলার বিক্রি বাজারে বান ডেকে দেওয়ার মতো কিছু নয়, এর উদ্দেশ্য হলো রিজার্ভ যথেষ্ট বড় রেখে দাম বাড়ার গতিতে একটা সীমা বসিয়ে দেওয়া, যাতে আতঙ্ক তৈরি না হয়। রিজার্ভ এখন পর্যন্ত এই কৌশলে সাড়া দিয়েছে। সেপ্টেম্বরের শেষে ৩৬.৩০ বিলিয়ন ডলার থেকে নেমে ৩৬.১৪ বিলিয়নে যাওয়ার পর, ১৭ অক্টোবর নাগাদ তা আবার বেড়ে ৩৬.৩৯ বিলিয়নে পৌঁছেছে (আইএমএফের কঠোর বিপিএম৬ হিসাবে যা ৩১.৫৮ বিলিয়ন ডলারের সমান), যা কেন্দ্রীয় ব্যাংককে বাফার দৃশ্যমানভাবে না কমিয়েও হস্তক্ষেপ চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ দিচ্ছে।

এই পুনরুদ্ধারের পেছনে রেমিট্যান্সের ভূমিকাই সবচেয়ে বড়। অক্টোবরের প্রথম ১৭ দিনেই প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছেন ১.৭৪ বিলিয়ন ডলার, এমন একটা অর্থবছরে যেখানে প্রবাহ এমনিতেই গত বছরের চেয়ে বেশ এগিয়ে। ঠিক এই নিয়মিত ডলারের ধারাই কেন্দ্রীয় ব্যাংককে বাজারে বিক্রি করার সুযোগ দিচ্ছে, অতীতের ডলার সংকটের মতো রিজার্ভ হুহু করে কমে যাওয়ার শঙ্কা ছাড়াই।

এরপর কী হতে পারে

নাম প্রকাশ না করে কথা বলা কর্মকর্তাদের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংক স্পষ্ট করে দিয়েছে যে আপাতত টাকা১২৪ সীমাটাই তারা ধরে রাখতে চায়, কারণ টাকার মান আরও কমে গেলে তা সরাসরি জ্বালানি, সার আর খাদ্যপণ্যের আমদানি খরচ বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতিতে যুক্ত হবে, এমন সময়ে যখন সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি এমনিতেই প্রায় ৮.৩ শতাংশের কাছে। তাই বড় একটা একক হস্তক্ষেপের বদলে এরকম ছোট ছোট বিক্রি বারবার হতে পারে, যা গত এক বছরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দর সামলানোর ধরনের সঙ্গেই মেলে। দুর্গাপূজার ছুটি শেষ হওয়ার পরের দিনগুলোতে চোখ রাখা জরুরি, যখন পেট্রোবাংলা আর বিপিসির পেছনে রাখা বকেয়া পরিশোধ শুরু হয় আর ব্যাংকে ডলারের চাহিদার লাইন আবার লম্বা হতে থাকে।

আপনার জন্য এর মানে কী

যারা ডলারে আমদানির দাম মেটান, তাদের জন্য টাকার মান প্রতি পয়সা কমলেই একটা চালানের হিসাবে তা জমে বড় হয়ে যায়, আর টাকা১২৪-এর দিকে এই চলমান ধাবন একটা সংকেত যে ছুটির পরের চাপ কমার জন্য বসে থাকার চেয়ে যেখানে সম্ভব আগেভাগে দর ঠিক করে রাখা ভালো। যারা রেমিট্যান্স পাঠান বা পান, তাদের জন্য টাকার মান কমে যাওয়া মানে স্থানীয় মুদ্রায় বেশি পাওয়া, যদিও জ্বালানি আর খাদ্যপণ্যের দাম একইসঙ্গে বাড়লে সেই লাভ সহজেই মুছে যেতে পারে। যারা ফিক্সড ডিপোজিটে টাকা রেখেছেন তাদের মনে রাখা ভালো, মূল্যস্ফীতি ঠেকাতে যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক টাকার দরপতন সীমিত রাখতে এত মনোযোগী, তারা শিগগির নীতি সুদহার কমাবে বলে মনে হয় না, ফলে এফডিআরের রিটার্নে আপাতত একটা মজবুত ভিত্তি থাকছে, আগ্রহীরা সাইটের এফডিআর রেট তুলনা টুল দিয়ে বর্তমান অফারগুলো দেখে নিতে পারেন। বিদেশে টিউশন ফি বা ভ্রমণের জন্য ডলার ভাঙাতে হলে লেনদেনের আগে কারেন্সি কনভার্টার-এ লাইভ রেট দেখে নেওয়া কাজে দিতে পারে।

মন্তব্য

    এখনো কোনো মন্তব্য নেই — প্রথম মন্তব্যটি করুন।

মন্তব্য করতে সাইন ইন করুন

এরপর পড়ুন

রিজার্ভের কুশন অক্ষুণ্ণ রেখে ১০ বিলিয়ন ডলারের দিকে এগোচ্ছে বাংলাদেশের রেমিট্যান্স

চলতি অর্থবছরের প্রথম সাড়ে তিন মাসে প্রবাসী বাংলাদেশিরা দেশে প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার পাঠিয়েছেন, যা আগের বছরের তুলনায় ১৩ শতাংশ বেশি। এই ধারাবাহিক প্রবাহ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বস্তির সীমার ওপরে রেখেছে, যদিও অক্টোবরের গতি আগস্টের শীর্ষ থেকে কিছুটা কমেছে।

মালদ্বীপ থেকে রেমিট্যান্স সহজ করতে টাকা রুফিয়া বিনিময়ের প্রস্তাব দিল বাংলাদেশ

মালদ্বীপে থাকা এক লাখের বেশি বাংলাদেশি কর্মী যাতে সহজে দেশে টাকা পাঠাতে পারেন, সেজন্য বাংলাদেশ ব্যাংক মালদ্বীপ মনিটরি অথরিটিকে একটা মুদ্রা সহযোগিতার প্রস্তাব দিয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মালদ্বীপ থেকে আনুষ্ঠানিক রেমিট্যান্স প্রায় ১৬.৪ শতাংশ কমে ১১৮ মিলিয়ন ডলারে নেমে আসার পর এই উদ্যোগ নেওয়া হলো, যদিও সেখানে বাংলাদেশি কর্মীর সংখ্যা এক লাখের ওপরেই আছে। প্রস্তাবে আছে এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নের মাধ্যমে রুফিয়া নিষ্পত্তি, টাকায় মূল্যায়িত ট্রাভেল কার্ড এবং সম্ভাব্য দ্বিপক্ষীয় মুদ্রা বিনিময়, তবে তিনটি পথই এখনও দুই পক্ষের নিয়ন্ত্রক অনুমোদনের অপেক্ষায়।

বিদেশ যাত্রীদের জন্য নগদ ডলার কেনার সীমা ৩,০০০ ডলারে বাড়াল বাংলাদেশ ব্যাংক

বাংলাদেশ ব্যাংক একজন যাত্রী এক লেনদেনে মানি চেঞ্জার থেকে কত নগদ ডলার কিনতে পারবেন তার সীমা ২,০০০ থেকে ৩,০০০ ডলারে বাড়িয়েছে। গত মাসে বার্ষিক ভ্রমণ কোটা ১৮,০০০ ডলারে বাড়ানোর পরের এই পদক্ষেপ। ২০২৪ সাল থেকে এই সীমাগুলো কীভাবে বদলেছে এবং বিদেশ যাওয়ার প্ল্যান থাকলে এর মানে কী, তা দেখে নেওয়া যাক।