বৈদেশিক মুদ্রা ও রেমিট্যান্স

রিজার্ভের কুশন অক্ষুণ্ণ রেখে ১০ বিলিয়ন ডলারের দিকে এগোচ্ছে বাংলাদেশের রেমিট্যান্স

১৮ অক্টোবর, ২০২৬4 মিনিটের পড়া
রিজার্ভের কুশন অক্ষুণ্ণ রেখে ১০ বিলিয়ন ডলারের দিকে এগোচ্ছে বাংলাদেশের রেমিট্যান্স

চলতি অর্থবছরের প্রথম সাড়ে তিন মাসে প্রবাসী বাংলাদেশিরা দেশে প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার পাঠিয়েছেন, যা আগের বছরের তুলনায় ১৩ শতাংশ বেশি। এই ধারাবাহিক প্রবাহ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বস্তির সীমার ওপরে রেখেছে, যদিও অক্টোবরের গতি আগস্টের শীর্ষ থেকে কিছুটা কমেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ১ জুলাই থেকে ১৩ অক্টোবর পর্যন্ত প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছেন ৯৯৭ কোটি ডলার, যা ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম ১০৫ দিনের হিসাব। আগের বছরের একই সময়ে এই অঙ্ক ছিল ৮৮৫ কোটি ৬০ লাখ ডলার, সেই হিসাবে প্রবৃদ্ধি প্রায় ১৩ শতাংশ। এই গতি বজায় থাকলে চলতি সপ্তাহের মধ্যেই ১০ বিলিয়ন ডলারের ঘর পার হয়ে যাবে বাংলাদেশ, যা দুই অর্থবছর আগে নভেম্বরের শুরুর দিকে গিয়ে অর্জিত হতো।

  • চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০৫ দিনে রেমিট্যান্স এসেছে ৯৯৭ কোটি ডলার, আগের বছরের তুলনায় ১৩ শতাংশ বেশি।
  • মাস হিসাবে জুলাইয়ে ২৮৬ কোটি, আগস্টে ২৯৭ কোটি এবং সেপ্টেম্বরে ২৭৬ কোটি ডলার এসেছে।
  • আইএমএফের বিপিএম৬ পদ্ধতিতে রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩১৩৮ কোটি ডলারে, যা দিয়ে প্রায় সাড়ে ৫ মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব।
  • পুরো ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রেমিট্যান্স এসেছিল রেকর্ড ৩৫৫৯ কোটি ডলার, চলতি বছর তার চেয়েও কিছুটা এগিয়ে আছে।

যে অর্থবছর নিজের রেকর্ডই ভাঙছে

অক্টোবরের প্রথম ১৩ দিনেই এসেছে ১৪০ কোটি ডলার, আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ১০.৬ শতাংশ বেশি। জুলাই থেকেই এই ধারা প্রায় থামেনি। মাসভিত্তিক হিসাবে জুলাইয়ে এসেছে ২৮৬ কোটি ডলার, আগস্টে ঈদুল আজহা সংক্রান্ত পাঠানোর কারণে তা বেড়ে হয় ২৯৭ কোটি ডলার, আর সেপ্টেম্বরে উৎসবের প্রভাব কমে যাওয়ায় তা নেমে আসে ২৭৬ কোটি ডলারে। তারপরও সেপ্টেম্বরের এই সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় ৩ শতাংশ বেশি ছিল, যা মাসে মাসে ওঠানামার আড়ালে আসল গল্পটা বলে দেয়। অর্থবছর শুরুর পর থেকে প্রবৃদ্ধির গতি একবারও থমকায়নি।

পুরো চিত্রটা একসাথে দেখলে, ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুনের মধ্যে রেমিট্যান্স এসেছিল রেকর্ড ৩৫৫৯ কোটি ডলার, যা আগের বছরের চেয়ে ১৭.৩৪ শতাংশ বেশি ছিল। চলতি অর্থবছরের শুরুর দিকের গতি মাসে গড়ে ২৯০ কোটি ডলারের বেশি, এই ধারা জুন পর্যন্ত বজায় থাকলে রেকর্ডটি আবার ভাঙতে পারে।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসের রেমিট্যান্স প্রবাহ দেখানো বার চার্ট
চার্ট, বিডি ফাইন্যান্সিয়াল রিভিউ, তথ্যসূত্র বাংলাদেশ ব্যাংক এবং দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস।

রিজার্ভের কুশন কেন এত গুরুত্বপূর্ণ

রেমিট্যান্স শুধু ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাবে গিয়ে জমা হয় না, এটি সরাসরি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভেও যুক্ত হয়। সাম্প্রতিক হিসাবে আইএমএফের কঠোরতর বিপিএম৬ পদ্ধতিতে রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩১৩৮ কোটি ডলার, আর গ্রস হিসাবে তা ৩৬১৯ কোটি ডলার। এই পরিমাণ দিয়ে প্রায় সাড়ে ৫ মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব, যা আইএমএফের নির্ধারিত ন্যূনতম ৩ মাসের নিরাপদ সীমার চেয়ে অনেক বেশি।

ধারাবাহিক রেমিট্যান্স প্রবাহ থেকে গড়ে ওঠা রিজার্ভ, স্বল্পমেয়াদি বিদেশি ঋণের তুলনায় কেন্দ্রীয় ব্যাংককে টাকার মান সামলাতে অনেক বেশি স্বস্তি দেয়, জরুরি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না, এই কথাটিই চলতি অর্থবছরে কর্মকর্তারা বারবার বলেছেন।

এটা গুরুত্বপূর্ণ কারণ গত তিন বছরের বড় একটা সময় বাংলাদেশকে রিজার্ভ সংকট ঠেকাতে বারবার আমদানি নিয়ন্ত্রণ এবং টাকার একাধিক দফা অবমূল্যায়নের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। নতুন বৈদেশিক ঋণ না নিয়ে মূলত প্রবাসী আয়ের মাধ্যমে গড়ে ওঠা এই কুশনকে অর্থনীতিবিদরা অনেক বেশি টিকসই বলে মনে করেন, কারণ এর সাথে কোনো পরিশোধের সময়সীমা জড়িয়ে নেই।

প্রবৃদ্ধির পেছনে যে কারণগুলো

মূলত তিনটি কারণ এই প্রবৃদ্ধির পেছনে কাজ করছে। মোবাইল ব্যাংকিং এবং ডিজিটাল রেমিট্যান্স অ্যাপের কারণে আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং চ্যানেল হুন্ডির তুলনায় প্রায় সমান গতির হয়ে উঠেছে, সঙ্গে মিলছে নিরাপত্তা এবং অনেক সময় ভালো বিনিময় হার। মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজার, যেখানে এখনো বাংলাদেশি প্রবাসী শ্রমিকদের বড় অংশ কাজ করেন, পুরো বছর ধরে তুলনামূলক স্থিতিশীল থেকেছে। আর টাকার বিনিময় হার, যদিও সম্প্রতি কিছুটা মজবুত হয়েছে, তাতে এমন বড় কোনো ওঠানামা হয়নি যা প্রবাসীদের আনুষ্ঠানিক চ্যানেল থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য করবে।

আপনার জন্য এর মানে কী

যে পরিবারগুলো রেমিট্যান্সের ওপর নির্ভরশীল, তাদের জন্য এই ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি স্বস্তির খবর। তবে আগস্ট থেকে সেপ্টেম্বরের এই পতনের মতো মাস ভিত্তিক ওঠানামা মনে করিয়ে দেয় যে একটি মাসের সংখ্যা দিয়ে পুরো গল্প বোঝা যায় না। নিয়মিত টাকা পাঠানো পরিবার হলে, আপনার ব্যাংক বা মোবাইল ওয়ালেট যে বিনিময় হার দিচ্ছে তা বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত হারের সঙ্গে তুলনা করে দেখা ভালো, বিশেষ করে যারা এখনও ক্যাশ পিকআপ সেবার ওপর নির্ভর করেন তাদের জন্য এই ফারাক পুরোপুরি মিটে যায়নি। বাড়ি কেনা বা ফিক্সড ডিপোজিট খোলার মতো বড় অঙ্কের টাকা পাঠানোর আগে সাইটের কারেন্সি কনভার্টার দিয়ে বর্তমান হার যাচাই করে নিতে পারেন।

সঞ্চয়কারী ও ছোট বিনিয়োগকারীদের জন্য সুস্থ রিজার্ভের অবস্থান সাধারণত মানে হলো টাকার হঠাৎ বড় অবমূল্যায়ন বা আমদানি নিয়ন্ত্রণ কড়াকড়ির চাপ কমে যাওয়া, যা ভোজ্যতেল থেকে ওষুধ পর্যন্ত আমদানি করা পণ্যের দামে স্থিতিশীলতা আনে। মূল্যস্ফীতি আর নীতি সুদহারের পাশাপাশি এটিও এমন একটি সংখ্যা যা নজরে রাখা দরকার, যদিও এটি নিয়ে কম আলোচনা হয়।

এরপর কী

বাংলাদেশ ব্যাংক কয়েক দিন পরপর রেমিট্যান্সের সর্বশেষ হিসাব প্রকাশ করে, এবং অক্টোবর মাসের পূর্ণ হিসাব প্রকাশ হলে বোঝা যাবে মাসের দ্বিতীয়ার্ধে এই গতি বজায় ছিল কিনা। বিশ্লেষকরা এটাও নজরে রাখবেন যে রবি শস্য মৌসুম এবং শীতের বিয়ের মৌসুম সামনে রেখে প্রবাসীরা সাধারণত যে বাড়তি টাকা পাঠান, সেই চিরাচরিত ধারা এবারও দেখা যায় কিনা।

মন্তব্য

    এখনো কোনো মন্তব্য নেই — প্রথম মন্তব্যটি করুন।

মন্তব্য করতে সাইন ইন করুন

এরপর পড়ুন

মালদ্বীপ থেকে রেমিট্যান্স সহজ করতে টাকা রুফিয়া বিনিময়ের প্রস্তাব দিল বাংলাদেশ

মালদ্বীপে থাকা এক লাখের বেশি বাংলাদেশি কর্মী যাতে সহজে দেশে টাকা পাঠাতে পারেন, সেজন্য বাংলাদেশ ব্যাংক মালদ্বীপ মনিটরি অথরিটিকে একটা মুদ্রা সহযোগিতার প্রস্তাব দিয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মালদ্বীপ থেকে আনুষ্ঠানিক রেমিট্যান্স প্রায় ১৬.৪ শতাংশ কমে ১১৮ মিলিয়ন ডলারে নেমে আসার পর এই উদ্যোগ নেওয়া হলো, যদিও সেখানে বাংলাদেশি কর্মীর সংখ্যা এক লাখের ওপরেই আছে। প্রস্তাবে আছে এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নের মাধ্যমে রুফিয়া নিষ্পত্তি, টাকায় মূল্যায়িত ট্রাভেল কার্ড এবং সম্ভাব্য দ্বিপক্ষীয় মুদ্রা বিনিময়, তবে তিনটি পথই এখনও দুই পক্ষের নিয়ন্ত্রক অনুমোদনের অপেক্ষায়।

বিদেশ যাত্রীদের জন্য নগদ ডলার কেনার সীমা ৩,০০০ ডলারে বাড়াল বাংলাদেশ ব্যাংক

বাংলাদেশ ব্যাংক একজন যাত্রী এক লেনদেনে মানি চেঞ্জার থেকে কত নগদ ডলার কিনতে পারবেন তার সীমা ২,০০০ থেকে ৩,০০০ ডলারে বাড়িয়েছে। গত মাসে বার্ষিক ভ্রমণ কোটা ১৮,০০০ ডলারে বাড়ানোর পরের এই পদক্ষেপ। ২০২৪ সাল থেকে এই সীমাগুলো কীভাবে বদলেছে এবং বিদেশ যাওয়ার প্ল্যান থাকলে এর মানে কী, তা দেখে নেওয়া যাক।

শক্তিশালী টাকা নিঃশব্দে কমিয়ে দিচ্ছে বাংলাদেশের রপ্তানি সুবিধা, ঠিক যখন রপ্তানি রেকর্ড ছুঁয়েছে

দেশের অভ্যন্তরীণ মূল্যস্ফীতি প্রায় ৯ শতাংশের কাছাকাছি থাকলেও জুলাই আর আগস্ট দুই মাসেই ডলারের বিপরীতে শক্তিশালী হয়েছে বাংলাদেশের টাকা, যা বাংলাদেশ ব্যাংকের রিয়াল এফেক্টিভ এক্সচেঞ্জ রেট সূচককে বাড়িয়ে নিয়ে গেছে ১০৫.৩৭ এ, এমন একটা মাত্রা যা বলে দেয় মুদ্রাটা এখন তার বাণিজ্য সহযোগীদের তুলনায় অতিমূল্যায়িত। নাম প্রকাশ না করা বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা বলেছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের টাকাকে অবমূল্যায়ন হতে দেওয়ার কথা ভাবা উচিত, আর সতর্ক করেছেন টাকা এভাবে শক্তিশালী থাকলে রপ্তানি আয় ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সময়টা একটু বেখাপ্পা, এই সতর্কবার্তা এসেছে ঠিক তখনই যখন বাংলাদেশের রপ্তানি এফওয়াই২৭ এর প্রথম প্রান্তিকে ৬.৩ শতাংশ বেড়ে পৌঁছেছে ১৩.১ বিলিয়ন ডলারে, যা প্রশ্ন তোলে একটা স্থায়ীভাবে অতিমূল্যায়িত মুদ্রা এই পুনরুদ্ধারের কতটুকু টিকিয়ে রাখতে দেবে।