বীমা

বীমা গ্রাহকদের পাওনা ৪,৪০৩ কোটি টাকার সামান্য অংশ, মাত্র ৩৭.৫ কোটি টাকা পরিশোধ করল আইডিআরএ

২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬5 মিনিটের পড়া
বীমা গ্রাহকদের পাওনা ৪,৪০৩ কোটি টাকার সামান্য অংশ, মাত্র ৩৭.৫ কোটি টাকা পরিশোধ করল আইডিআরএ

বাংলাদেশের বীমা নিয়ন্ত্রক সংস্থা এই মাসে দুই ধাপে ৮,৪১৭ জন পলিসিহোল্ডারকে ৩৭ কোটি ৫৪ লাখ টাকা পরিশোধ করেছে, কিন্তু প্রায় ১২ লাখ পলিসিহোল্ডারের পাওনা ৪,৪০৩ কোটি টাকার তুলনায় এটা সামান্যই। নিয়ন্ত্রকরা বলছেন জড়িত ৩২টি সমস্যাগ্রস্ত কোম্পানির কিছু বছরের পর বছর গোপন ডাবল সার্ভারের মাধ্যমে প্রকৃত আর্থিক অবস্থা লুকিয়ে রেখেছিল। আইডিআরএ এখন সবচেয়ে খারাপ অবস্থার কোম্পানিগুলোর জমি, বন্ড আর ফিক্সড ডিপোজিট বিক্রি করে আরও পেমেন্টের টাকা জোগাড় করছে, পাশাপাশি ডিসেম্বরের মধ্যে ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি মডেল আর চার মাসের মধ্যে ডিজিটাল পলিসি পরিচিতি ব্যবস্থা চালুর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

বাংলাদেশের বীমা নিয়ন্ত্রক সংস্থা এই মাসে দুই ধাপে ৮ হাজার ৪১৭ জন পলিসিহোল্ডারকে মোট ৩৭ কোটি ৫৪ লাখ টাকা পরিশোধ করেছে, আর আইডিআরএ এটাকে দেখাচ্ছে দাবি নিষ্পত্তি কর্মসূচি কাজ করছে তার প্রমাণ হিসেবে। কিন্তু পুরো সমস্যার আকারের সাথে তুলনা করলে এই সংখ্যাটা খুবই সামান্য। প্রায় ১২ লাখ পলিসিহোল্ডারের প্রায় ৪ হাজার ৪০৩ কোটি টাকার দাবি এখনো অপরিশোধিত রয়ে গেছে, যাদের বেশিরভাগই এমন সব জীবন বীমা কোম্পানির গ্রাহক যাদের সম্পর্কে নিয়ন্ত্রকরা বলছেন তারা বছরের পর বছর ধরে নিজেদের প্রকৃত আর্থিক অবস্থা লুকিয়ে রেখেছিল, এমনকি খোদ আইডিআরএর কাছ থেকেও।

এই লুকোচুরির আসল কৌশলটা প্রকাশ পায় আগস্টের শেষ দিকে, যখন আইডিআরএ জানায় কিছু বীমা কোম্পানি গোপনে দুটো আলাদা সার্ভার চালাচ্ছিল, একটা আরেকটা হিসাব বই বলা যায়, যেটা দিয়ে প্রকৃত দাবির তথ্য নিয়ন্ত্রক আর নিরীক্ষক দুজনের কাছ থেকেই আড়াল করা হতো। এখন ৩২টি কোম্পানিকে চিহ্নিত করা হয়েছে যারা দেনা মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে, তার মধ্যে সাতটির নিষ্পত্তির রেকর্ড সবচেয়ে খারাপ। এই সাতটি কোম্পানি, বৈরা লাইফ ইনস্যুরেন্স, ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইনস্যুরেন্স, গোল্ডেন লাইফ ইনস্যুরেন্স, হোমল্যান্ড লাইফ ইনস্যুরেন্স, পদ্মা ইসলামী লাইফ ইনস্যুরেন্স, প্রগ্রেসিভ লাইফ ইনস্যুরেন্স, সানফ্লাওয়ার লাইফ ইনস্যুরেন্স এবং সানলাইফ ইনস্যুরেন্স, কেই আইডিআরএ প্রথমে হাতে নিয়েছে।

প্রথম দুই ধাপে যা হয়েছে

৩ সেপ্টেম্বর শেষ হওয়া প্রথম ধাপে এই সাতটি জীবন বীমা কোম্পানির ২ হাজার ৫৪৯ জন পলিসিহোল্ডারকে ১৪ কোটি ৫১ লাখ টাকা দেওয়া হয়। এরপর ১৩ ও ১৪ সেপ্টেম্বর দ্বিতীয় ধাপে ৫ হাজার ৮৬৮ জন পলিসিহোল্ডারকে দেওয়া হয় ২৩ কোটি ৩ লাখ টাকা, যার মধ্যে শুধু পদ্মা ইসলামী লাইফ ইনস্যুরেন্স থেকেই ৩ হাজার ৬০০ জনকে দেওয়া হয়েছে ১২ কোটি টাকা, এরপর ফারইস্ট ইসলামী লাইফকে ৫ কোটি, হোমল্যান্ড লাইফকে ৪ কোটি ৯৮ লাখ, আর তুলনামূলক ছোট অঙ্ক গেছে সানফ্লাওয়ার লাইফ আর সানলাইফ ইনস্যুরেন্সে। আইডিআরএ বলছে তারা এই টাকা জোগাড় করছে সরকারি তহবিল থেকে না নিয়ে বরং সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর নিজস্ব সম্পদ আর জামানত বন্ড থেকে, আগে আসলে আগে পাবে এই নীতিতে, যাতে টাকা নড়াচড়া শুরু হয় আর পাশাপাশি প্রতিটা কোম্পানির খাতা থেকে আরও কীভাবে টাকা তোলা যায় সেটাও ঠিক করা যায়।

আইডিআরএর চেয়ারম্যান মীর নাদিয়া নিভীন এই নিষ্পত্তিকে শুধু আলাদা আলাদা পেমেন্ট হিসেবে না দেখে বড় প্রেক্ষাপটে দেখছেন, তার কথায় দ্রুত আর স্বচ্ছ দাবি নিষ্পত্তি জরুরি বীমা খাতে মানুষের হারিয়ে যাওয়া আস্থা ফিরিয়ে আনতে। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার খান মোহাম্মদ শামীম আজিজ, যিনি এই খাতের সমস্যাগুলো নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করছেন, আরও কড়া পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন, তার দাবি পলিসিহোল্ডারদের প্রতিশ্রুত টাকা রক্ষা করতে কোম্পানিগুলোর আরও সম্পদ উদ্ধার করা দরকার।

এখনো যে ফারাক রয়ে গেছে

সংখ্যাগুলো দেখলেই বোঝা যায় বর্তমান নিষ্পত্তি কর্মসূচি আর সংকট প্রকৃত অর্থে সমাধানের মধ্যে কতটা দূরত্ব রয়ে গেছে। শুধু একটা কোম্পানির কাছেই প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার দাবি অপরিশোধিত পড়ে আছে, আর আইডিআরএর হিসাবে সেই একটা কোম্পানির সব সম্পদ, জমি, ট্রেজারি বন্ড, ফিক্সড ডিপোজিট, বিক্রি করলেও উঠবে বড়জোর ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, মানে দেনার অর্ধেকও কভার হবে না। এই ধরনের ঘাটতি ৩২টি সমস্যাগ্রস্ত কোম্পানি জুড়ে গুণ করলে, আর এখন পর্যন্ত প্রক্রিয়া করা সাতটি কোম্পানিরই এখনো বকেয়া প্রায় ১০০ কোটি টাকা যোগ করলে, পুরো ৪ হাজার ৪০৩ কোটি টাকার গর্তটা ঠিক কত বড় বোঝা সহজ হয়ে যায়।

ধাপতারিখপরিশোধিত অঙ্কপলিসিহোল্ডার
প্রথম ধাপ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬১৪ কোটি ৫১ লাখ টাকা২,৫৪৯ জন
দ্বিতীয় ধাপ১৩ থেকে ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬২৩ কোটি ৩ লাখ টাকা৫,৮৬৮ জন
এ পর্যন্ত মোট পরিশোধসেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত৩৭ কোটি ৫৪ লাখ টাকা৮,৪১৭ জন
এখনো বকেয়া (৩২টি কোম্পানি মিলিয়ে)চলমানপ্রায় ৪,৪০৩ কোটি টাকাপ্রায় ১২ লাখ জন

এই কারণেই আইডিআরএ নিজেও সেপ্টেম্বরের এই পেমেন্টগুলোকে একটা দীর্ঘ প্রক্রিয়ার প্রথম ধাপ হিসেবে দেখাচ্ছে, চূড়ান্ত সমাধান হিসেবে না। সংস্থাটির পরিকল্পনা হলো সমস্যাগ্রস্ত কোম্পানিগুলোর জমি, সরকারি ট্রেজারি বন্ড আর ফিক্সড ডিপোজিটের মতো সম্পদ বিক্রি করে সেই টাকা নজরদারিতে থাকা একটা হিসাবে জমা রাখা, আর তহবিল যতটা পাওয়া যায় ততটা দিয়ে আগে আসলে আগে পাবে নীতিতে বাকি দাবি মেটানো। শুধু প্রথম সাতটি কোম্পানির বকেয়া ১০০ কোটি টাকা কবে নাগাদ পুরোপুরি মেটানো হবে তারও এখনো কোনো সরকারি সময়সীমা নেই, বাকি ৩২টি কোম্পানির অনেক বড় বকেয়ার কথা তো আরও দূরের ব্যাপার।

এত দিন সংকটটা ধরা পড়ল না কেন

ডাবল সার্ভারের এই বিষয়টা একটু থেমে ভাবার মতো, কারণ এটাই বুঝিয়ে দেয় কীভাবে ৪,৪০৩ কোটি টাকার একটা ফাঁক তৈরি হয়ে গেল আগেভাগে কোনো হস্তক্ষেপ ছাড়াই। যেকোনো দেশের বীমা নিয়ন্ত্রকই মূলত নির্ভর করে কোম্পানি নিজে যে তথ্য দেয় তার উপর, তার সাথে অডিট আর নিয়মিত পরিদর্শন মিলিয়ে দেখা হয়, প্রতিটা পলিসির পুরোদস্তুর ফরেনসিক পরীক্ষা করা হয় না। কোনো কোম্পানি যদি ভেতরের ব্যবহারের জন্য একটা গোপন হিসাব রাখে আর অডিটর ও আইডিআরএকে দেখায় আরেকটা পরিষ্কার চেহারা, তাহলে বছরের পর বছর তার বকেয়া দাবির প্রকৃত অঙ্ক কম দেখানো সম্ভব, বিশেষ করে বার্ষিক পরিদর্শনও যদি কোম্পানির অন্য জায়গায় জমা দেওয়া সেই একই মিথ্যা সংখ্যার উপর নির্ভর করে থাকে। এই ধরনের ফাঁকই বন্ধ করতে চাইছে আইডিআরএর প্রস্তাবিত ডিজিটাল পরিচিতি ব্যবস্থা, যেখানে প্রতিটা পলিসি একটা কেন্দ্রীয়ভাবে দেখা যাওয়া একক রেকর্ডের সাথে যুক্ত থাকবে, কোনো বীমা কোম্পানি নিজে ইচ্ছামতো যা প্রকাশ করতে চায় তার উপর নির্ভর করবে না।

এটাই বুঝিয়ে দেয় কেন আইডিআরএর চেয়ারম্যান এটাকে শুধু একটা বিচ্ছিন্ন পরিষ্কার অভিযান না বলে পুরো খাতের বিশ্বাসযোগ্যতার পরীক্ষা বলছেন। বাংলাদেশে জীবন বীমা টিকে থাকে এমন একটা আস্থার উপর যা দশকের পর দশক ধরে ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছে, কারণ বেশিরভাগ পলিসিহোল্ডার বছরের পর বছর প্রিমিয়াম দিয়ে যান তবেই কোনো পেআউট পান, মেয়াদ শেষে হোক বা কোনো দাবির মাধ্যমে। ইচ্ছাকৃতভাবে জাল হিসাব রাখার এই কেলেঙ্কারি হাতেগোনা কয়েকটা কোম্পানিতে হলেও এই স্বাভাবিক প্রশ্ন তোলে, এখন পর্যন্ত প্রক্রিয়া করা সাতটির বাইরে চিহ্নিত বাকি ২৫টি কোম্পানির মধ্যে আর কতগুলোতে এমন গোপন দায় লুকিয়ে আছে যা এখনো সামনে আসেনি।

পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে যেসব সংস্কার আসছে

পেমেন্টের বাইরে আইডিআরএ এই নিষ্পত্তি কর্মসূচির সাথে দুটো কাঠামোগত সংস্কার জুড়ে দিয়েছে, দুটোরই লক্ষ্য সেই রিপোর্টিংয়ের ফাঁক বন্ধ করা যা এত দিন ধরে ডাবল সার্ভারের মতো কারসাজি ধরা পড়তে দেয়নি। ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি মডেল চালু হওয়ার কথা ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে, যাতে আইডিআরএর নজরদারি আরও আগেভাগে দুর্বল আর্থিক অবস্থার কোম্পানি চিহ্নিত করতে পারে, শুধু কোম্পানির নিজের দেওয়া তথ্যের ওপর নির্ভর না করে, যে তথ্যই এত দিন এই সংকট আড়াল করে রেখেছিল। এর পাশাপাশি নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি চাইছে চার মাসের মধ্যে বীমা পলিসির জন্য একটা কেন্দ্রীয় ডিজিটাল পরিচিতি ব্যবস্থা চালু করতে, যাতে কোনো কোম্পানির পক্ষে দ্বিতীয় কোনো জাল হিসাব বই রাখা প্রায় অসম্ভব হয়ে যায়।

যে প্রায় ১২ লাখ পলিসিহোল্ডার এখনো অপেক্ষা করছেন, যাদের বেশিরভাগই জীবন বীমা কিনেছিলেন কোনো ফাটকা বিনিয়োগ হিসেবে না বরং দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা হিসেবে, তাদের কাছে সংস্কারের চেয়ে বড় প্রশ্ন হলো পেমেন্টের গতি। আইডিআরএর নিজের সংখ্যা বলছে প্রথম দুই ধাপের যে গতি, তাতে চললে হাজার হাজার পলিসিহোল্ডারের দাবি মিটতে বছরের পর বছর লেগে যেতে পারে, আর এই বাস্তবতাই নিয়ন্ত্রক সংস্থার ওপর চাপ বাড়াচ্ছে যাতে তারা হয় সম্পদ উদ্ধারের গতি বাড়ায়, নয়তো সমস্যাগ্রস্ত কোম্পানিগুলোর নিজস্ব সম্পদের বাইরে আরও কোনো তহবিলের উৎস খুঁজে বের করে।

মন্তব্য

    এখনো কোনো মন্তব্য নেই — প্রথম মন্তব্যটি করুন।

মন্তব্য করতে সাইন ইন করুন

এরপর পড়ুন

আস্থা ফেরাতে আরও ২৩ কোটি টাকার বকেয়া বীমা দাবি মেটাচ্ছে আইডিআরএ

বাংলাদেশের ইন্স্যুরেন্স ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড রেগুলেটরি অথরিটি ১৪ সেপ্টেম্বর ৫,৮৬৮ জন পলিসিধারীকে ২৩.০৩ কোটি টাকার বকেয়া দাবি পরিশোধ করছে, দুই সপ্তাহেরও কম সময়ে এটি দ্বিতীয় এমন নিষ্পত্তি ধাপ, আর এর পেছনে লুকিয়ে থাকা অনেক বড় সংকটের সর্বশেষ প্রমাণ। শিল্প খাতের তথ্য অনুযায়ী দেশজুড়ে প্রায় ৪৪,০৩০ কোটি টাকার অপরিশোধিত জীবন বীমা দাবি জমে আছে, যা প্রায় ১২ লাখ পলিসিধারীকে প্রভাবিত করছে, আর নিষ্পত্তির হার আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের অনেক নিচে নেমে গেছে। আইডিআরএ কোম্পানিগুলো টাকা জোগাড় করার জন্য অপেক্ষা না করে সংকটে থাকা বীমা কোম্পানিগুলোর নিজস্ব সম্পদ আর জামানত বন্ড বিক্রি করে এই অর্থ পরিশোধ করছে, পাশাপাশি আরও ধারালো প্রয়োগ ক্ষমতা দেওয়ার মতো একটা নতুন অধ্যাদেশের জন্য চাপ দিচ্ছে। এই ঘটনা এ বছর বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে উন্মোচিত সুশাসনের ব্যর্থতারই প্রতিধ্বনি করে।