বাণিজ্য ও রপ্তানি

দুর্গাপূজায় বেনাপোল স্থলবন্দর বন্ধ, আট দিন থমকে থাকবে সীমান্ত বাণিজ্য

১৯ অক্টোবর, ২০২৬4 মিনিটের পড়া
দুর্গাপূজায় বেনাপোল স্থলবন্দর বন্ধ, আট দিন থমকে থাকবে সীমান্ত বাণিজ্য

ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সবচেয়ে ব্যস্ত স্থলবন্দরটা আট দিনের জন্য চুপচাপ হয়ে যাচ্ছে। বেনাপোল দিয়ে সাধারণত দেশে স্থলপথে আসা পণ্যের প্রায় ৯০ শতাংশ ঢোকে, আর সীমান্তের দুই পাশের দুর্গাপূজার ছুটি একসঙ্গে পড়ায় এই বন্দরের পণ্য পরিবহন ১৭ থেকে ২৪ অক্টোবর বন্ধ থাকছে। আসলে কী চালু থাকছে, ট্রাক চলাচলে এর প্রভাব কতটা, আর গেট বন্ধ হওয়ার আগে আমদানিকারক-রপ্তানিকারকদের কী করা উচিত, তা নিয়েই এই প্রতিবেদন।

ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সবচেয়ে ব্যস্ত স্থলবন্দরটা আট দিনের জন্য একদম চুপচাপ হয়ে যাচ্ছে। বেনাপোল দিয়ে সাধারণত বাংলাদেশে স্থলপথে আসা পণ্যের প্রায় ৯০ শতাংশ ঢোকে, আর এই বন্দরের পণ্য পরিবহন ১৭ থেকে ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত বন্ধ থাকছে, কারণ সীমান্তের দুই পাশেই দুর্গাপূজার ছুটি বাংলাদেশের নিজের উৎসবের ছুটির সঙ্গে মিলে গেছে। বাণিজ্য আবার শুরু হওয়ার কথা ২৫ অক্টোবর সকালে, ততদিন যে কয়েকশ ট্রাক স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন সীমান্ত পার হতো, সেগুলো শুধু অপেক্ষাই করবে।

  • বেনাপোলের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম ২০ থেকে ২৪ অক্টোবর বন্ধ থাকবে, ভারতের পেট্রাপোল বন্দরে পণ্য পরিবহন বন্ধ থাকবে ১৭ থেকে ২১ অক্টোবর।
  • দুটো মিলিয়ে পুরো বন্ধের সময়টা আট দিন, ১৭ থেকে ২৪ অক্টোবর, বাণিজ্য আবার শুরু হবে ২৫ অক্টোবর থেকে।
  • বেনাপোল দিয়ে স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন ৩০০ থেকে ৩৫০ ট্রাক আমদানি পণ্য আর প্রায় ১০০ ট্রাক রপ্তানি পণ্য যাওয়া-আসা করে।
  • ১৮ আর ১৯ অক্টোবর সীমিত পরিসরে কাস্টমস ছাড়করণ চলবে, আর ইলিশ মাছ রপ্তানির জন্য আলাদা ছাড় থাকবে।

দুটো আলাদা ছুটি, একটাই সীমান্ত

এই বন্ধটা আসলে দুটো আলাদা সময়সূচি, যেগুলো একই সময়ে পড়ে গেছে। ভারতের দিকে পেট্রাপোল দুর্গাপূজার জন্য ১৭ থেকে ২১ অক্টোবর পণ্য চলাচল বন্ধ রাখছে, এই একই উৎসবের জন্যই বাংলাদেশেও ছুটি থাকছে। বাংলাদেশের দিকে বেনাপোলের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম ২০ থেকে ২৪ অক্টোবর বন্ধ থাকছে, পূজার তিন দিনের ছুটি সাপ্তাহিক শুক্র-শনিবারের ছুটির সঙ্গে মিলে। পুরো সময়টায় যাত্রী পারাপার চালু থাকবে, আর যে ভারতীয় ট্রাকচালকরা আগেই মাল খালাস করে ফেলেছেন, তারা পুরো বন্ধের সময়টা অপেক্ষা না করে খালি ট্রাক নিয়ে ফিরে যেতে পারবেন। বেনাপোল সি অ্যান্ড এফ এজেন্টস স্টাফ অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক বদরুজ্জামান বনি ১২ অক্টোবর দুই পাশের এই ব্যবস্থাই নিশ্চিত করেছেন, আর বেনাপোলের ভারপ্রাপ্ত বন্দর পরিচালক রুহুল আমিন নিশ্চিত করেছেন যে ২০ তারিখ থেকে পুরোপুরি বন্ধের আগে ১৮ আর ১৯ অক্টোবর সীমিত পরিসরে কার্গো সেবা চালু থাকবে।

কী চালু থাকছে, কী থাকছে না

বন্দর একদম অন্ধকার হয়ে যাচ্ছে না। ১৮ আর ১৯ অক্টোবর কাস্টমস মূল্যায়ন, কার্গো ছাড়করণ আর মাল তোলা-নামানোর কাজ চলবে, এতে আমদানিকারক আর রপ্তানিকারকরা ২০ থেকে ২৪ অক্টোবরের পূর্ণ বন্ধের আগে ইতিমধ্যে পাইপলাইনে থাকা মাল ছাড় করানোর একটা ছোট সুযোগ পাবেন। পূজার মৌসুমে রাজনৈতিক আর সাংস্কৃতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ইলিশ মাছ রপ্তানির জন্য আলাদা ছাড় থাকছে, সাধারণ বন্ধ কার্যকর হয়ে গেলেও বিশেষ ব্যবস্থায় এটা চলতে পারবে। আর সবকিছু, ভারত থেকে আসা তুলা, সিন্থেটিক কাপড়, স্টিল, লোহা, রাসায়নিক, রং আর গাড়ি, এবং অন্যদিকে যাওয়া পোশাক, পাটের সুতা আর অন্যান্য তৈরি পণ্য, এই পুরো সময়টায় একদম থেমে থাকবে।

যতটা থেমে যাচ্ছে তার পরিমাণ

বেনাপোলের দৈনিক পরিমাণ দেখলেই বোঝা যায় আট দিনের এই বন্ধ আসলে বাস্তবে কতটা প্রভাব ফেলে। স্বাভাবিক দিনে ভারত থেকে ৩০০ থেকে ৩৫০ ট্রাক পণ্য আসে, আর বিপরীত দিকে প্রায় ১০০ ট্রাক পণ্য যায়। ভারতের ল্যান্ড পোর্টস অথরিটির তথ্য বলছে, সংযুক্ত পেট্রাপোল বন্দর দিয়ে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বার্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ৩৬,৬৩৩ কোটি রুপির বেশি, ১,৫৪,০০০-এর বেশি কার্গো চলাচলে, যা আগের বছরের ৩০,৪২০ কোটি রুপি আর ১,৪৫,২৮০ চলাচল থেকে বেশি। একাধিক দিনের এই বন্ধ সেই পরিমাণ উধাও করে দেয় না, বরং পিছিয়ে দেয়, মানে ২৫ অক্টোবরের ঠিক পরের দিনগুলোতে সাধারণত জমে থাকা ট্রাকের একটা ঢল দেখা যায়, কারণ দুই বন্দরই বন্ধের সময়ে জমে থাকা সারি একসাথে সামলাতে থাকে।

পেট্রাপোল-বেনাপোল বাণিজ্য২০২৩-২৪ অর্থবছর২০২৪-২৫ অর্থবছর
বাণিজ্যের মূল্য (ভারতীয় রুপি)৩০,৪২০.৯২ কোটি রুপি৩৬,৬৩৩.৭৯ কোটি রুপি
কার্গো চলাচল১,৪৫,২৮০১,৫৪,১৯২
দৈনিক স্বাভাবিক ট্রাক (বাংলাদেশে আমদানি)৩০০ থেকে ৩৫০
দৈনিক স্বাভাবিক ট্রাক (ভারতে রপ্তানি)প্রায় ১০০

সূত্র, ল্যান্ড পোর্টস অথরিটি অব ইন্ডিয়া, বেনাপোল আর পেট্রাপোলের ক্লিয়ারিং এজেন্ট সংগঠনের মাধ্যমে।

এটা প্রথমবার নয় যে দুর্গাপূজায় এই সীমান্ত বন্ধ হচ্ছে। গত বছর সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে একই রকম একটা বন্ধ ছয় দিন ধরে চলেছিল, তারপর বাণিজ্য আবার শুরু হয়। এ বছরের বন্ধ আট দিনের, যা আগের চেয়ে লম্বা, কারণ এ বছর উৎসবের ক্যালেন্ডার সীমান্তের দুই পাশের সাপ্তাহিক ছুটির সঙ্গে আগের তুলনায় কম সুবিধাজনকভাবে মিলে গেছে।

আপনার জন্য এর মানে কী

যারা বেনাপোল দিয়ে পণ্য আনা-নেওয়া করেন, তাদের জন্য বাস্তব করণীয় হলো ১৮ আর ১৯ অক্টোবরের সুযোগটা কাজে লাগিয়ে বন্দরে থাকা মাল ছাড় করিয়ে নেওয়া, এক সপ্তাহের বেশি আটকে রাখার বদলে, আর এখনই এই বন্ধের বিষয়টা ডেলিভারি সময়সূচিতে ধরে নেওয়া, শিপমেন্ট সময়ে না পৌঁছালে পরে বিপদে পড়ার বদলে। যে ব্যবসাগুলো উৎপাদনের জন্য আমদানি করা তুলা, সিন্থেটিক ফাইবার বা রাসায়নিকের ওপর নির্ভর করে, তাদের উচিত নিজেদের হাতে থাকা মজুদ এই বন্ধের সময়টা চলার জন্য যথেষ্ট কিনা দেখে নেওয়া, কারণ নতুন শিপমেন্ট অক্টোবরের শেষের আগে আসার সম্ভাবনা নেই। ভারতের বাজারে পোশাক বা পাটজাত পণ্য রপ্তানি করা ব্যবসায়ীরা উল্টো সমস্যায় পড়বেন, এই সপ্তাহে সীমান্ত পার হওয়ার কথা থাকা তৈরি পণ্য সীমিত ছাড়করণের সুযোগে পাঠানো উচিত, না হলে বন্দর খোলার জন্য অপেক্ষা করতে হবে।

বাকি সবার জন্য বরং এটা বোঝা জরুরি যে এই বন্ধ কী প্রভাব ফেলে না। এটা একটা স্থলসীমান্তের ঘটনা, মুদ্রা বা ব্যাংকিংয়ের নয়, টাকার বিনিময় হার আর বৃহত্তর বাণিজ্য ভারসাম্যের ওপর একটা সীমান্তে আট দিনের বন্ধের সরাসরি কোনো প্রভাব পড়ে না, যত বড়ই হোক। বাংলাদেশের সামগ্রিক বাণিজ্য পরিস্থিতি যারা অনুসরণ করেন, তারা বেনাপোল খোলার পর আমদানি-রপ্তানির হিসাবে যে উল্লম্ফন দেখা যায় তার দিকে নজর রাখতে পারেন, সীমান্তে কিছুদিন নীরবতাকে বাণিজ্য দুর্বল হওয়ার লক্ষণ ধরার বদলে।

২৫ অক্টোবরের পর কী হবে

বেনাপোল আর পেট্রাপোল দুটোই ২৫ অক্টোবর সকাল থেকে পুরো কার্যক্রমে ফেরার কথা। এর আগের এমন বন্ধের অভিজ্ঞতা বলছে, বন্ধের পরের কয়েক দিন সাধারণত স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ট্রাক চলাচল দেখা যায়, কারণ বন্ধের সময় জমে থাকা মাল ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে বের হতে থাকে, তাই বন্দর প্রযুক্তিগতভাবে খুলে গেলেও তার ঠিক পরের দিনগুলোয় ডেলিভারির সময়সূচি স্বাভাবিকের চেয়ে একটু বেশি লাগতে পারে।

মন্তব্য

    এখনো কোনো মন্তব্য নেই — প্রথম মন্তব্যটি করুন।

মন্তব্য করতে সাইন ইন করুন

এরপর পড়ুন

ইইউতে জার্মানিকে পেছনে ফেলে বাংলাদেশের শীর্ষ পোশাক ক্রেতা স্পেন

ইউরোপীয় ইউনিয়নে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় পোশাক ক্রেতা হিসেবে জার্মানিকে পেছনে ফেলেছে স্পেন, FY27 এর প্রথম প্রান্তিকে রপ্তানি পৌঁছেছে ১.১৪ বিলিয়ন ডলারে, জার্মানির ১.১২ বিলিয়ন ডলারের বিপরীতে। বিজিএমইএ বলছে এই পরিবর্তন জার্মান খুচরা বিক্রেতাদের ওপর জ্বালানি খরচের চাপের প্রতিফলন, অন্যদিকে স্পেনের ক্রেতারা শক্তিশালী অর্ডার দিয়েই চলছেন। শিল্প নেতারা সতর্ক করছেন এই পরিবর্তন স্থায়ী না হতে পারে, কিন্তু এটা দেখায় বাংলাদেশের ৪.৯ বিলিয়ন ডলারের ইইউ পোশাক বাণিজ্য কত দ্রুত বদলে যেতে পারে।

পোশাক ছাড়িয়ে যুক্তরাজ্যে ১০ বিলিয়ন ডলার রপ্তানির লক্ষ্য বাংলাদেশের

যুক্তরাজ্যের আমদানি বাজারে বাংলাদেশের অংশ এখন মাত্র ০.৪৯ শতাংশ, এবং কর্মকর্তারা বলছেন এই অংশ দ্বিগুণ করে ১ শতাংশে নিতে পারলে তা বছরে ১০ বিলিয়ন ডলার রপ্তানির সমান হতে পারে। বাংলাদেশ আজ যুক্তরাজ্যে যা বিক্রি করে তার মধ্যে পোশাক ছাড়া অন্য পণ্যের অংশ মাত্র প্রায় ৬ শতাংশ, যদিও প্রসেসড ফুড, ওষুধ, জুতা ও আসবাবপত্রের চাহিদা আছে। যুক্তরাজ্যের একটি বাণিজ্য সুবিধা স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বের হওয়ার পরও এই প্রবেশাধিকারের বেশিরভাগ শুল্কমুক্ত রাখবে, তবে রপ্তানিকারকদের এখনও মান ও সার্টিফিকেশনের ঘাটতি পূরণ করতে হবে।

উত্তরায় শ্রমিক বিক্ষোভের পর নতুন মজুরি বোর্ড গঠনে উদ্যোগী সরকার, দাবি মাসে ৩০,০০০ টাকা

উত্তরায় শ্রমিকদের সড়ক অবরোধের একদিন পর বাংলাদেশের শ্রম মন্ত্রণালয় কারখানা মালিক ও শ্রমিকদের কাছ থেকে নতুন মজুরি বোর্ডের জন্য প্রতিনিধির নাম চাইছে, বিক্ষোভের দাবি ছিল মাসিক মজুরি ৩০,০০০ টাকা করা। বর্তমান ন্যূনতম মজুরি ১২,৫০০ টাকা ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে নির্ধারিত হয়েছিল, এবং শ্রমিক নেতারা বলছেন আইন অনুযায়ী পর্যালোচনা এমনিতেই দেরি হয়ে গেছে। কারখানা মালিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর মধ্যে পরের মজুরি বোর্ড ঠিক কবে আসবে তা নিয়ে মতভেদ আছে, যা নতুন মজুরি ২০২৭ বা ২০২৮ সাল পর্যন্ত বিলম্বিত করতে পারে।