তিন বছরে প্রথম রোডশো, সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে টাকা৪০০ কোটির আইপিও আনছে কনফিডেন্স পাওয়ার
১৮ অক্টোবর কনফিডেন্স পাওয়ার বাংলাদেশের প্রায় তিন বছরের মধ্যে প্রথম আইপিও রোডশো করেছে, বুক বিল্ডিংয়ের মাধ্যমে টাকা৪০০ কোটি তুলে কক্সবাজার আর মোংলায় দুটো ১০০ মেগাওয়াট সৌর প্রকল্পে অর্থায়নের লক্ষ্যে। তাদের সর্বশেষ হিসাব বলছে, ২০২৬ অর্থবছরে রাজস্ব ২৬ শতাংশ কমলেও নিট মুনাফা প্রায় অক্ষুণ্ণ ছিল, যা বিনিয়োগকারীদের বুক খোলার আগে ভাবার মতো একটা মার্জিনের গল্প। এই রোডশো আসলে পরীক্ষা করছে, বাংলাদেশের দীর্ঘদিন স্থির থাকা আইপিও পাইপলাইন খোলার নিয়ন্ত্রক প্রচেষ্টা সত্যিই কাজ করছে কিনা।
১৮ অক্টোবর রেডিসন ব্লু ঢাকা ওয়াটার গার্ডেনে কনফিডেন্স পাওয়ার তাদের আইপিও রোডশো করেছে, বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে প্রায় তিন বছরের মধ্যে এই ধরনের প্রথম আয়োজন। কোম্পানিটি বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে টাকা৪০০ কোটি তুলতে চায়, দুটো সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে অর্থায়নের জন্য, আর তাদের সর্বশেষ বার্ষিক হিসাবের সংখ্যাগুলো বিনিয়োগকারীদের জন্য বুক খোলার আগে ভাবার মতো অনেক কিছুই দিচ্ছে।
- বুক বিল্ডিংয়ের মাধ্যমে কনফিডেন্স পাওয়ার টাকা৪০০ কোটি তুলছে, এটাই ২০২৩ সালের অক্টোবরে টেকনো ড্রাগসের টাকা১০০ কোটি তোলার পর প্রথম রোডশো।
- ২০২৬ অর্থবছরে রাজস্ব ২৬ শতাংশ কমে টাকা১৭৭০.৮৫ কোটিতে নেমেছে, আগের বছর যা ছিল টাকা২৩৯৯.৭৩ কোটি, তবে নিট মুনাফা তুলনামূলক ভালোভাবে টিকে আছে, মাত্র ১.৮৫ শতাংশ কমে টাকা৪৭৭.৪১ কোটি হয়েছে।
- তোলা টাকার মধ্যে টাকা৩৩২ কোটি সরাসরি যাচ্ছে কক্সবাজার আর মোংলার দুটো নতুন ১০০ মেগাওয়াট সৌর প্রকল্পে, প্রতিটিরই রাষ্ট্রীয় গ্রিডের সঙ্গে ২০ বছরের বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি আছে।
- এই রোডশো বাংলাদেশের আইপিও বাজারের বৃহত্তর গলন প্রক্রিয়ার অংশ, যেখানে নিয়ন্ত্রকরা দ্রুত অনুমোদনের সময়সীমা আর নতুন তালিকাভুক্তির পথ দিয়ে জট খোলার চেষ্টা করছেন।
এক নজরে সংখ্যাগুলো
| টাকা৪০০ কোটি আইপিওর অর্থ কোথায় যাবে | পরিমাণ |
|---|---|
| কক্সবাজার (উত্তর), চট্টগ্রামে ১০০ মেগাওয়াট সৌর প্রকল্প | টাকা২৩০ কোটি |
| কনফিডেন্স অ্যান্ড ডরিন পাওয়ারে বিনিয়োগ (১০০ মেগাওয়াট মোংলা সৌর) | টাকা১০২ কোটি |
| ঋণের আংশিক পরিশোধ | টাকা৬০ কোটি |
| আইপিওর খরচ | টাকা৮ কোটি |
ইউসিবি ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড ইস্যু ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে আছে আর প্রাইম ব্যাংক ইনভেস্টমেন্ট পিএলসি রেজিস্ট্রার। প্রতি শেয়ারের দাম বা কতটি শেয়ার ছাড়া হবে তা এখনো জানানো হয়নি, রোডশো পর্বে এটাই স্বাভাবিক বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে, যেখানে প্রথমে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা দর নির্ধারণে সহায়তার জন্য বিড করে, এর পরে খুচরা বিনিয়োগকারীরা একটা নির্দিষ্ট কাট অফ দামে অংশ নেওয়ার সুযোগ পান।
যে কোম্পানির মুনাফা রাজস্বের চেয়ে বেশি টিকে থাকার ক্ষমতা দেখাচ্ছে
২০২৬ সালের ৩০ জুন শেষ হওয়া বছরে একত্রিত রাজস্ব ২৬ শতাংশ কমে টাকা১৭৭০.৮৫ কোটিতে নেমেছে, আগের বছর যা ছিল টাকা২৩৯৯.৭৩ কোটি, কিন্তু মোট মুনাফা আসলে বেড়েছে, টাকা৬২৬.২৭ কোটি থেকে টাকা৬৪১.৪০ কোটিতে, আর কর পরবর্তী নিট মুনাফা কমেছে মাত্র ১.৮৫ শতাংশ, টাকা৪৭৭.৪১ কোটিতে। শেয়ার প্রতি আয় হয়েছে টাকা৩১.৪৩, আগের টাকা৩২.৪৩ থেকে কম। সহজ ভাষায়, কনফিডেন্স পাওয়ার কম বিক্রি করেছে কিন্তু যা বিক্রি করেছে তার থেকে বেশি রেখে দিতে পেরেছে, এটা চাহিদার গল্প নয়, বরং মার্জিনের গল্প, আর বুক বিল্ডিং বিনিয়োগকারীদের জন্য শুধু রাজস্বের পতনের চেয়ে এই বিষয়টাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হবে।
টাকা৪০০ কোটি আসলে কী কিনছে
তোলা অর্থের বড় অংশ, দুটো প্রকল্পের মধ্যে মিলিয়ে টাকা৩৩২ কোটি, সৌরবিদ্যুৎ সক্ষমতা বাড়াতে যাচ্ছে। কক্সবাজার প্রকল্পে বাংলাদেশ পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট বোর্ডের সঙ্গে ২০ বছরের বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তির আওতায় ১০০ মেগাওয়াট যুক্ত হবে, আর মোংলা প্রকল্প, যা কনফিডেন্স অ্যান্ড ডরিন পাওয়ার লিমিটেডের মাধ্যমে পরিচালিত, যেখানে কনফিডেন্স পাওয়ারের ৬০ শতাংশ অংশীদারত্ব আছে, একই ধরনের শর্তে আরও ১০০ মেগাওয়াট যুক্ত করবে। মাত্র টাকা৬০ কোটি যাচ্ছে বিদ্যমান ঋণ কমাতে, আর টাকা৮ কোটি যাচ্ছে তালিকাভুক্তির খরচ মেটাতে।
এটা এমন একটা কোম্পানি যা তার পাবলিক লিস্টিংকে ব্যালান্স শিট মজবুত করার বদলে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বাজি রাখছে। কনফিডেন্স গ্রুপ বলছে, তারা ২০২৮ সালের মধ্যে সৌরবিদ্যুতে টাকা৪০০০ কোটির বেশি বিনিয়োগ করার পরিকল্পনা করছে, যার মধ্যে আছে চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে পরিকল্পিত আলাদা একটা ২০০ মেগাওয়াট প্ল্যান্ট, খরচ প্রায় টাকা২০০০ কোটি। গ্রুপের সক্ষমতার লক্ষ্য ২০২৯ সালের মধ্যে প্রায় ১০০০ মেগাওয়াট, ২০৩২ সালের মধ্যে ১৯৬০ মেগাওয়াট আর ২০৩৫ সালের মধ্যে ২১৬০ মেগাওয়াট, বর্তমান সক্ষমতা বগুড়া, রংপুর আর চট্টগ্রামের চারটা প্ল্যান্টে মিলিয়ে ৩৯৩ মেগাওয়াট।
রোডশো নিজেই কেন খবর
বাংলাদেশের প্রাইমারি মার্কেট এই দিক থেকে বড় সময় ধরে স্থির ছিল, এর আগে তুলনীয় রোডশো হয়েছিল টেকনো ড্রাগসের টাকা১০০ কোটি তোলার সময়, ২০২৩ সালের অক্টোবরে, প্রায় তিন বছর আগে। নিয়ন্ত্রকরা এই বছরের বেশিরভাগ সময় আইপিওর জট খোলার চেষ্টায় ব্যয় করেছেন, যার মধ্যে আছে ডিরেক্ট লিস্টিংয়ের সীমা দ্বিগুণ করা আর দর নির্ধারণ দ্রুত করার জন্য ডাচ নিলাম পদ্ধতি চালুর পরিকল্পনা, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন যখন এগুলো ঘোষণা করেছিল তখন এই সাইট তা নিয়ে প্রতিবেদন করেছিল। কনফিডেন্স পাওয়ারের রোডশো, যেখানে ঢাকা আর চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের প্রতিনিধি, যোগ্য বিনিয়োগকারী, নিরীক্ষক আর মার্চেন্ট ব্যাংকার হাজির হয়েছেন, এখন পর্যন্ত সবচেয়ে স্পষ্ট প্রমাণ যে অন্তত একটা বড় ইস্যুয়ার এই গলন সত্যি কিনা তা পরীক্ষা করতে রাজি।
খাত নির্বাচনটাও কাকতালীয় নয়। দশকের পর দশক ধরে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন গ্যাস আর আমদানি করা জ্বালানির ওপর ভারীভাবে নির্ভরশীল, আর আঞ্চলিক জ্বালানির দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দুটোই আরও খরুচে হয়ে উঠেছে, যার ফলে সৌরবিদ্যুৎ থেকে ২০ বছরের টাকায় নির্দিষ্ট আয় বাঁধা একটা কোম্পানির গল্প এখন স্থানীয় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রি করা একটা চক্রাকার রপ্তানি কোম্পানির চেয়ে সহজ। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে জ্বালানি খাতের শেয়ারও এই বছর বেশ আলোচনায় এসেছে, কারণ বিদ্যুৎ সংকট গ্যাসনির্ভর কোম্পানিগুলোর আয়ে চাপ ফেলেছে, তাই একটা নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদক নতুন শেয়ার ছাড়তে আসছে এমন একটা সময়ে যখন বাজার এমনিতেই গভীরভাবে ভাবছে কোন জ্বালানি কোম্পানি এই চাপ থেকে সুরক্ষিত আর কোনটা নয়।
আপনার জন্য এর মানে কী
যারা আইপিওর দিকে চোখ রাখেন, তাদের জন্য এখানকার সংকেতটা শুধু কনফিডেন্স পাওয়ার নিয়ে নয়, বরং বছরের পর বছর মোটামুটি জমে থাকা পাইপলাইনের পর বুক বিল্ডিং ইস্যু আবার মানুষকে আকর্ষণ করতে পারে কিনা তা নিয়ে, এই রোডশোতে চাহিদা, যা এখনো প্রকাশ্য নয়, পরবর্তী লাইনে থাকা ইস্যুয়ারের দর নির্ধারণকে প্রভাবিত করবে। যারা ইতিমধ্যে কনফিডেন্স পাওয়ার বা তার তালিকাভুক্ত সহযোগী কোম্পানিতে বিনিয়োগ রেখেছেন, তাদের জন্য রাজস্ব কমলেও মার্জিনের এই স্থিতিশীলতাই মনে রাখার মতো সংখ্যা, কারণ এটা শুধু বিক্রির শিরোনাম সংখ্যার চেয়ে খরচ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বেশি কথা বলে। আর সাবস্ক্রিপশনের জন্য অপেক্ষার সময় সঞ্চয় কোথায় রাখবেন তা ভাবলে, সাইটের এফডিআর রেট তুলনা টুল দিয়ে বর্তমান স্থায়ী আমানতের অপশনগুলো দেখে নেওয়া ভালো, কারণ একটা বুক বিল্ডিং আইপিও রোডশো থেকে তালিকাভুক্তি পর্যন্ত যেতে কয়েক সপ্তাহ লেগে যেতে পারে।
তথ্যসূত্র
এরপর পড়ুন
বাংলাদেশে পণ্য ডেরিভেটিভ লেনদেনে ছয়টি ব্রোকারকে অনুমোদন, আসলে এর মানে কী
শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা ছয়টি ব্রোকারেজ হাউসকে পণ্য ডেরিভেটিভ লেনদেনের সবুজ সংকেত দিয়েছে, যা বাংলাদেশের দীর্ঘ প্রতীক্ষিত পণ্য বিনিময়ের দিকে একটি বাস্তব পদক্ষেপ। প্রথম ধাপে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের প্ল্যাটফর্মে সোনা, রুপা ও পাম তেলের ফিউচার চুক্তি থাকবে, ধারণাটি প্রথম অনুমোদনের বহু বছর পর। পণ্য ডেরিভেটিভ আসলে কী, এই তিনটি পণ্য কেন প্রথমে এলো, এবং লেনদেন সত্যিই শুরু হলে বিনিয়োগকারী ও আমদানিনির্ভর ব্যবসায়ীদের জন্য এর মানে কী হবে তা এখানে ব্যাখ্যা করা হলো।
ঢাকার শেয়ারবাজার নেমেছে ৫,৪২২-এ, নিষ্প্রাণ লেনদেনে টেক্সটাইলের দাপট
রোববার, ১৮ অক্টোবর ডিএসইএক্স সূচক ১০ পয়েন্ট কমে ৫,৪২২-এ নেমেছে, পরপর দুই কার্যদিবস ধরে পতন, আর লেনদেনের পরিমাণ কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৩৬৫ কোটি টাকায়। মোট লেনদেনের ২৩ শতাংশ একাই এসেছে টেক্সটাইল খাত থেকে, আর ডিএসইর একজন কর্মকর্তা বলেছেন এত কম লেনদেনের একটা কারণ ছিল একটা নির্ধারিত প্রযুক্তিগত পরীক্ষা।
সরাসরি তালিকাভুক্তির সীমা দ্বিগুণ করল বিএসইসি, আইপিওর খরা কাটাতে আনছে ডাচ নিলাম পদ্ধতি
বাংলাদেশের শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক বড় পারিবারিক এবং বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাজারে আনতে একগুচ্ছ সংস্কারের ঘোষণা দিয়েছে, যার মধ্যে আছে নতুন তালিকাভুক্তির জন্য ডাচ নিলাম মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি এবং সরাসরি তালিকাভুক্তির যোগ্যতার সীমা দ্বিগুণ করা। বাজার এখনও করপোরেট অর্থায়নের তিন চতুর্থাংশের জন্য ব্যাংকের ওপর নির্ভরশীল, এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থা চায় এটি বদলাক।