অর্থ মন্ত্রণালয় তিন রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের এমডি বরখাস্ত করে নতুন নিয়োগ নীতি জারি করল
১৯ অক্টোবর অর্থ মন্ত্রণালয় সোনালী, জনতা ও রূপালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল করেছে, গত সাত সপ্তাহে এটি দ্বিতীয় দফা রদবদল। একই দিনে মন্ত্রণালয় নতুন এমডি নিয়োগের অভিজ্ঞতাগত শর্ত শিথিল করেছে, যোগ্য প্রার্থীদের জন্য বাধ্যতামূলক দুই বছরের ডিএমডি অভিজ্ঞতার নিয়ম বাদ দিয়ে। সেপ্টেম্বরের শুরু থেকে এখন ছয়টি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক স্থায়ী এমডি ছাড়াই চলছে। এই ব্যাংকগুলোর আমানতকারী ও ঋণগ্রহীতারা এমন সময়ে নেতৃত্বশূন্যতার মুখে পড়লেন যখন সরকার খেলাপি ঋণ পরিষ্কারের বড় পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে।
- ১৯ অক্টোবর অর্থ মন্ত্রণালয় সোনালী, জনতা ও রূপালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের চুক্তি বাতিল করেছে, সেপ্টেম্বরের শুরু থেকে এটি দ্বিতীয় দফা রদবদল।
- ২ সেপ্টেম্বর একইভাবে অগ্রণী ব্যাংক, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেড ও বেসিক ব্যাংকের এমডি অপসারিত হয়েছিলেন, এখনও কাউকে স্থায়ীভাবে বসানো হয়নি।
- একই দিনে জারি হওয়া নতুন নিয়োগ নীতিতে যোগ্য প্রার্থীদের জন্য বাধ্যতামূলক দুই বছরের ডিএমডি অভিজ্ঞতার শর্ত শিথিল করা হয়েছে।
- খেলাপি ঋণ রেকর্ড পর্যায়ে থাকা অবস্থায় এখন ছয়টি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক স্থায়ী এমডি ছাড়াই চলছে।
১৯ অক্টোবর বাংলাদেশের অর্থ মন্ত্রণালয় সোনালী, জনতা ও রূপালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল করে দেশের সবচেয়ে বড় রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে এক সপ্তাহের মধ্যে আরও তিনজন শীর্ষ কর্তাকে সরিয়ে দিল। এই সিদ্ধান্ত এসেছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের উপসচিব আফরোজা আক্তার রিবার সই করা এক চিঠিতে, যা তিনটি ব্যাংকের চেয়ারম্যানের কাছে পাঠানো হয়েছে। চিঠিতে প্রকাশ্যে কোনো কারণ বলা হয়নি, শুধু বলা হয়েছে পরিচালনা পরিষদকে প্রযোজ্য নিয়ম অনুসারে পরবর্তী পদক্ষেপ নিতে হবে, যার বাস্তব অর্থ হলো একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে বসিয়ে নতুন এমডি খোঁজার প্রক্রিয়া শুরু করা।
যে তিনজন এমডিকে সরানো হলো
শওকত আলী খান ২০২৪ সালের ৩০ অক্টোবর থেকে দেশের সবচেয়ে বড় রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংক সোনালী ব্যাংকের এমডি ছিলেন, এর আগে তিনি বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের প্রধান ছিলেন। কাজী মো. ওয়াহিদুল ইসলাম ২০২৪ সালের ২৫ ডিসেম্বর রূপালী ব্যাংকের দায়িত্ব নেন। মজিবুর রহমান ২০২৪ সালের ১১ নভেম্বর থেকে জনতা ব্যাংকের এমডি ও সিইও ছিলেন। স্বাভাবিকভাবে তিন বছরের চুক্তিতে নিয়োগ পাওয়া এই তিনজনই তাদের মেয়াদের প্রায় মাঝপথে এসে পদ হারালেন।
| ব্যাংক | অপসারিত এমডি | নিয়োগের তারিখ | দায়িত্বে ছিলেন |
|---|---|---|---|
| সোনালী ব্যাংক | শওকত আলী খান | ৩০ অক্টোবর ২০২৪ | প্রায় ২ বছর |
| রূপালী ব্যাংক | কাজী মো. ওয়াহিদুল ইসলাম | ২৫ ডিসেম্বর ২০২৪ | প্রায় ২২ মাস |
| জনতা ব্যাংক | মজিবুর রহমান | ১১ নভেম্বর ২০২৪ | প্রায় ২৩ মাস |
এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়
গত সাত সপ্তাহে এটি দ্বিতীয়বার যখন অর্থ মন্ত্রণালয় রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের শীর্ষ নেতৃত্ব সরিয়ে দিল। ২ সেপ্টেম্বর মন্ত্রণালয় অগ্রণী ব্যাংক, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেড ও বেসিক ব্যাংকের এমডিদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল করেছিল। মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, এই সপ্তাহ পর্যন্ত তিনটির কোনোটিতেই স্থায়ী প্রতিস্থাপন করা হয়নি। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এমডি পদে পরিবর্তনের বিষয়েও আলোচনা চলছে বলে জানা গেছে। সব মিলিয়ে, সেপ্টেম্বরের শুরু থেকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর প্রায় অর্ধেকের শীর্ষ নেতৃত্ব অপসারিত হয়েছে বা প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
নতুন এমডির জন্য শর্ত এখন সহজ
তিন এমডিকে বরখাস্ত করার দিনই আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকের এমডি ও সিইও নিয়োগের জন্য নতুন নীতি জারি করেছে, যা ২৬ জুলাই থেকে কার্যকর থাকা আগের নীতির জায়গা নিয়েছে। মূল পরিবর্তন হলো, যাদের ডিএমডি হিসেবে দুই বছরের অভিজ্ঞতা নেই তাদেরও যোগ্যতা, নেতৃত্বের রেকর্ড ও সুনামের ভিত্তিতে বিবেচনা করা যাবে। প্রার্থীদের অবশ্যই কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে সক্রিয় কর্মী হিসেবে কমপক্ষে ২০ বছরের অভিজ্ঞতা, স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি, শিক্ষাজীবনের কোনো স্তরে তৃতীয় বিভাগ না থাকা এবং আইটি সুরক্ষা, সাইবার ঝুঁকি ও অর্থ পাচার প্রতিরোধ সম্পর্কে কাজ চালানোর মতো জ্ঞান থাকতে হবে। একটি বাছাই কমিটি গোয়েন্দা প্রতিবেদন ও দুর্নীতি দমন কমিশনের প্রতিবেদন যাচাই করে একজন প্রার্থীকে সুপারিশ করে, যার পরে প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন প্রয়োজন হয়। ব্যাংকের পরিচালনা পরিষদ বাংলাদেশ ব্যাংকের সম্মতিক্রমে তিন বছরের নবায়নযোগ্য মেয়াদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়। বিশেষায়িত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নিয়ম অপরিবর্তিত থেকেছে, যেখানে এখনও পুরো দুই বছর ডিএমডি থাকার শর্ত বহাল।
পুল বড় করার এই ভাবনা নতুন নয়। গত বছরই একটি খসড়া নীতিতে প্রস্তাব করা হয়েছিল যে ৬৫ বছরের কম বয়সী অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার, এমনকি সাবেক এমডি ও ডিএমডিরাও বাধ্যতামূলক গোয়েন্দা ও দুর্নীতি দমন কমিশনের ছাড়পত্র নিয়ে এই পদে প্রতিযোগিতা করতে পারবেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর তখন বলেছিলেন, এটি "সৎ, নিবেদিতপ্রাণ ও প্রমাণিত ব্যাংকারদের এই খাতে অবদান রাখার সুযোগ তৈরি করবে।" সবাই একমত ছিলেন না; অগ্রণী ব্যাংকের সাবেক এমডি সৈয়দ আবু নাসের বুখতিয়ার আহমেদ বলেছিলেন, তার বিশ্বাস "৫০ বছরের নিচে কাউকে এমডি করা ঠিক নয়, কারণ অভিজ্ঞতার গুরুত্ব অনেক বেশি।" এই সপ্তাহে জারি হওয়া নীতি সেই একই দিকে এগিয়েছে, তবে এক বছর আগের তুলনায় যোগ্য প্রার্থীর সংখ্যা এখন বেশ কম।
বরখাস্ত করতে করতেই শর্ত কেন সহজ করা হলো
প্রথম দেখায় এটি স্ববিরোধী মনে হতে পারে, একদিকে অভিজ্ঞ এমডিদের বিদায় করা হচ্ছে, অন্যদিকে পদে বসার শর্ত সহজ করা হচ্ছে। কিন্তু কতগুলো পদ একসঙ্গে খালি হয়েছে তা হিসাব করলে দুটো সিদ্ধান্ত একসাথে বোঝা যায়। ছয় বা তার বেশি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের শীর্ষ পদ অনিশ্চিত থাকা অবস্থায় মন্ত্রণালয়ের দরকার সাধারণ ডিএমডি থেকে ধীরে ধীরে ওঠার চেয়ে বড় একটি প্রার্থী তালিকা। সততা ও দুর্নীতি দমন কমিশনের যাচাই অক্ষত রেখে অভিজ্ঞতার শর্ত শিথিল করা সেপ্টেম্বরের অপসারণের পর যেমন মাসের পর মাস ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা দিয়ে চালানোর পরিস্থিতি হয়েছিল, তা এড়ানোর একটি উপায়।
আপনার টাকার জন্য এর মানে কী
সাধারণ আমানতকারীদের জন্য সোনালী, জনতা ও রূপালী ব্যাংকে দৈনন্দিন লেনদেন স্বাভাবিকভাবেই চলবে। শাখা সংখ্যা ও আমানতের পরিমাণে এগুলো দেশের সবচেয়ে বড় রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে, আর একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিয়মিত কাজ চালিয়ে নিতে পারেন। আসল ঝুঁকি সেখানে, যেখানে শীর্ষে একজন আত্মবিশ্বাসী, স্থায়ী সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী প্রয়োজন, যেমন চাপে থাকা ঋণ পুনর্গঠন, ডিজিটাল ব্যাংকিং উন্নয়নের কাজ এগিয়ে নেওয়া, বা জ্বালানি সংকট থেকে সদ্য সামলে ওঠা শিল্পে নতুন ঋণ অনুমোদন করা। এই তিন ব্যাংকের কোনোটিতে ঋণের আবেদন জমা দিয়ে রাখা গ্রাহকদের কিছুটা দেরি হওয়ার প্রস্তুতি রাখা ভালো, যতদিন না একজন স্থায়ী এমডি বসেন।
কোথায় ফিক্সড ডিপোজিট রাখবেন তা ঠিক করার সময়, কোনো রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে নেতৃত্বের অস্থিরতা থাকলেই তা এড়িয়ে চলার কারণ নয়। বেসরকারি ব্যাংকের তুলনায় রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের পেছনে সরকারের একটি পরোক্ষ নিশ্চয়তা থাকে, আর আমানতের সুদের হার কে চালাচ্ছে তার চেয়ে বেশি নির্ভর করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতির ওপর। তবু টাকা জমা দেওয়ার আগে কোথায় সবচেয়ে বেশি মুনাফা পাচ্ছেন তা যাচাই করে নেওয়া ভালো, এই সাইটের নিজস্ব এফডিআর রেট তুলনা টুল বিভিন্ন ব্যাংকের বর্তমান হার একসঙ্গে দেখিয়ে দেয়, যাতে আপনাকে আন্দাজে চলতে না হয়।
তথ্যসূত্র
এরপর পড়ুন
ন্যাশনাল ব্যাংক আমানতকারীদের টাকা ফেরত দেওয়া শুরু করলো, সঙ্গে ১১টি শর্ত
ন্যাশনাল ব্যাংক পিএলসি ১৫ অক্টোবর থেকে কাউন্টার খুলে সেই প্রায় ১১ হাজার গ্রাহককে টাকা দেওয়া শুরু করেছে, যারা চার দিন ধরে টাকা তোলার জন্য অপেক্ষা করছিলেন। এর পেছনে আছে সোনালী ব্যাংকের ৭ হাজার কোটি টাকার জরুরি ঋণ, বাংলাদেশ ব্যাংকের বসানো এগারোটা শর্ত, আর এমন একটা ব্যালান্স শিট যার অগ্রিম-আমানত অনুপাত নিয়ন্ত্রক সীমার চেয়ে অনেক বেশি, ১৩২ শতাংশ।
বিদেশি ব্যাংকের মুনাফা প্রথমার্ধে ৩৮ শতাংশ কমল, ট্রেজারি বাজিতে এগিয়ে দেশি ব্যাংক
বাংলাদেশে কার্যরত নয়টি বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকের সম্মিলিত নিট মুনাফা ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে ৩৮ শতাংশ কমে হয়েছে ২,৩২১ কোটি টাকা, দুর্বল বাণিজ্য অর্থায়ন ও জ্বালানি সংকটের কারণে। একই সময়ে, অনেক তালিকাভুক্ত দেশি ব্যাংক ভালো মুনাফা বৃদ্ধি দেখিয়েছে, যার প্রায় পুরোটাই এসেছে সরকারি সিকিউরিটিজের বিনিয়োগ আয় থেকে, নতুন ঋণ বিতরণ থেকে নয়। বিদেশি ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের হার খাতের গড়ের চেয়ে এখনও অনেক কম এবং তাদের মূলধন মজুদ অনেক বেশি শক্তিশালী।
উত্তোলনের চাপে ন্যাশনাল ব্যাংককে ৭,০০০ কোটি টাকা ধার দিল সোনালী ব্যাংক, পরীক্ষার মুখে বাংলাদেশের বেলআউট পরিকল্পনা
রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক ন্যাশনাল ব্যাংককে ৭,০০০ কোটি টাকা ধার দিয়েছে, যার পুরোটার গ্যারান্টি দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক, তিন দিনে প্রায় ৭,৫০০টি উত্তোলনের আবেদন আসার পর। এই ঋণ ন্যাশনাল ব্যাংককে ১৫ অক্টোবরের মধ্যে পুরো উত্তোলন সুবিধা ফিরিয়ে আনার সময়সীমা পূরণে সহায়তা করার জন্য। ব্যাংকটি এখনো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণী, যা সিকদার পরিবারের আমলে শুরু হওয়া সমস্যার গভীরতার কথা মনে করিয়ে দেয়।