বাণিজ্য ও রপ্তানি

আশুলিয়ায় ৩০ কারখানা বন্ধের পর আজ মজুরি বোর্ড গঠন করছে বাংলাদেশ

১ নভেম্বর, ২০২৬4 মিনিটের পড়া
আশুলিয়ায় ৩০ কারখানা বন্ধের পর আজ মজুরি বোর্ড গঠন করছে বাংলাদেশ

শনিবার মজুরির দাবিতে বিক্ষোভ আশুলিয়ায় প্রায় ৩০টি কারখানা বন্ধ করে দিয়েছে এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে রূপ নিয়েছে, যেখানে পুলিশ টিয়ারগ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করেছে। শ্রমিকরা মাসিক সর্বনিম্ন মজুরি ৩০,০০০ টাকা দাবি করছেন, যা বর্তমান ১২,৫০০ টাকার দ্বিগুণেরও বেশি। শ্রম প্রতিমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলেছেন, আজ রোববার সরকার দীর্ঘ প্রতিশ্রুত মজুরি বোর্ড আনুষ্ঠানিকভাবে গঠন করবে। এর আগে দুই সপ্তাহ ধরে একই দাবিতে গাজীপুর ও মিরপুরে ছোট পরিসরে বিক্ষোভ চলছিল।

  • শনিবার মজুরি নিয়ে বিক্ষোভ পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে রূপ নেওয়ায় আশুলিয়ায় প্রায় ৩০টি পোশাক কারখানা ছুটি ঘোষণা করেছে, পুলিশ টিয়ারগ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করেছে।
  • শ্রমিকরা মাসিক সর্বনিম্ন মজুরি ৩০,০০০ টাকা দাবি করছেন, যা ২০২৩ সালে নির্ধারিত বর্তমান ১২,৫০০ টাকার দ্বিগুণেরও বেশি।
  • শ্রম প্রতিমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলেছেন, আজ রোববার সরকার দীর্ঘ প্রতিশ্রুত মজুরি বোর্ড গঠন করবে, যা মজুরি পর্যালোচনা করবে।
  • এই অস্থিরতার আগে গাজীপুর ও মিরপুরে দুই সপ্তাহ ধরে ছোট ছোট বিক্ষোভ চলছিল, মন্ত্রী সতর্ক করেছেন যে দীর্ঘ সময় কারখানা বন্ধ থাকলে রপ্তানি চালান ও ক্রেতাদের অর্থপ্রদানে দেরি হতে পারে।

বাংলাদেশের পোশাক শিল্প এলাকায় দুই সপ্তাহ ধরে চাপা থাকা মজুরি বিরোধ শনিবার বড় আকারে ফেটে পড়ল। ঢাকার উত্তর প্রান্তের শিল্পাঞ্চল আশুলিয়ায় বিক্ষোভকারী শ্রমিকরা প্রায় ৩০টি কারখানা বন্ধ করে দেন এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ান, পুলিশ তখন টিয়ারগ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড ছুঁড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। পুলিশ সদস্যসহ কয়েকজন আহত হন। সরকারের পক্ষ থেকে জবাব আসে এক দিনের মধ্যেই, শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, এই শিল্পের প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিকের মজুরি পর্যালোচনার জন্য রোববার, ১ নভেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে মজুরি বোর্ড গঠন করা হবে।

দুই সপ্তাহের বাড়তে থাকা বিক্ষোভে মূল দাবিটা একটুও বদলায়নি, শ্রমিকরা মাসিক সর্বনিম্ন মজুরি ৩০,০০০ টাকা চান, যা প্রায় ২৪৫ ডলারের সমান এবং ২০২৩ সালের শেষ মজুরি বোর্ড সংশোধনে ঠিক করা বর্তমান ১২,৫০০ টাকার দ্বিগুণেরও বেশি। তাদের বক্তব্য, খাবার, বাড়িভাড়া, যাতায়াত ও চিকিৎসার খরচ এতটাই বেড়ে গেছে যে এই মজুরিতে ঢাকা ও আশপাশে জীবনধারণের মৌলিক খরচই মিটছে না।

বিক্ষোভ যেভাবে বড় হলো

এই বিরোধের সময়রেখা দেখাচ্ছে, মাঠে শ্রমিকদের ক্ষোভ যে গতিতে বাড়ছিল, সরকারের পদক্ষেপ বারবার তার চেয়ে পিছিয়ে থাকছিল। শ্রম অধিদপ্তর প্রথম নতুন মজুরি বোর্ডের জন্য মালিক ও শ্রমিক সংগঠনকে প্রত্যেককে তিনজন প্রতিনিধির নাম দিতে বলে ১৫ অক্টোবর। মালিকপক্ষ দ্রুত নাম দিলেও শ্রমিক সংগঠনগুলো তা করেনি। ২৭ অক্টোবরের ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে আরিফুল শ্রমিক সংগঠনগুলোকে আরও এক সপ্তাহ সময় দেন, এবং প্রতিশ্রুতি দেন যে নাম পাওয়ার দুই দিনের মধ্যেই মজুরি বোর্ড গঠনের গেজেট প্রকাশ করা হবে।

এই প্রতিশ্রুতি ছোট বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়া থামাতে পারেনি। ২৭ অক্টোবর কালিয়াকৈরে এসেনশিয়াল ক্লথিং লিমিটেডের শ্রমিকরা ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করে এবং কারখানার গেটে ইট ছুঁড়ে মারে, কাছাকাছি প্রায় আধডজন কারখানা সেদিন বন্ধ হয়ে যায়। বিজিএমইএর সহসভাপতি মো. রেজওয়ান সেলিম বলেন, একই সময়ে মিরপুরের চার-পাঁচটি কারখানায় একই ধরনের বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। শনিবারের মধ্যে এই অস্থিরতা পৌঁছে যায় আরও বড় কারখানা কেন্দ্র আশুলিয়ায়, এবং রাস্তা অবরোধ থেকে বেড়ে গিয়ে সরাসরি পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে রূপ নেয়।

"মজুরি বোর্ড গঠন নিয়ে আমরা গেজেট বিজ্ঞপ্তি জারি করব," শ্রম প্রতিমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, শ্রমিকদের কাজে ফিরতে অনুরোধ করে তিনি সতর্ক করে দেন যে বাইরের কোনো পক্ষ এই বিরোধের সুযোগ নিলে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তারিখঘটনা
১৫ অক্টোবরশ্রম অধিদপ্তর মালিক ও শ্রমিক পক্ষকে তিনজন করে মজুরি বোর্ড প্রতিনিধির নাম দিতে বলে
২৭ অক্টোবরত্রিপক্ষীয় বৈঠক, মন্ত্রী নাম জমা দিতে শ্রমিকদের আরও এক সপ্তাহ সময় দেন, কালিয়াকৈর ও মিরপুরে বিক্ষোভ শুরু
২৮ অক্টোবরমজুরি দাবি ও বকেয়া বেতনের কারণে গাজীপুর ও মিরপুরে আধডজন কারখানা বন্ধ
৩১ অক্টোবরআশুলিয়ায় প্রায় ৩০টি কারখানা বন্ধ, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে কয়েকজন আহত
১ নভেম্বরসরকার জানায়, আনুষ্ঠানিকভাবে মজুরি বোর্ড গঠন করা হবে

কারখানার গেটের বাইরেও কেন এটা গুরুত্বপূর্ণ

পোশাক রপ্তানি বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি জোগায় এবং জিডিপির প্রায় এক-দশমাংশ অবদান রাখে, তাই এই মাপের শ্রমিক বিরোধ কখনো শুধু কারখানার ভেতরের বিষয় থাকে না। আরিফুলের সতর্কবার্তা, দীর্ঘ সময় কারখানা বন্ধ থাকলে চালান ও ক্রেতাদের অর্থপ্রদানে দেরি হতে পারে, এটাই আসল ঝুঁকির দিকে ইঙ্গিত করে, আন্তর্জাতিক ক্রেতারা কড়া উৎপাদন সময়সূচি মেনে চলেন, আর যে কারখানা জাহাজীকরণের সময় মিস করে, সে কেবল এই মৌসুমেই নয়, ভবিষ্যতের সোর্সিং সিদ্ধান্তেও ভিয়েতনাম, ভারত বা কম্বোডিয়ার প্রতিযোগীদের কাছে অর্ডার হারাতে পারে।

কারখানা মালিকরা বলছেন, তারাও অন্য দিক থেকে চাপে আছেন। তাদের ভাষ্য, বাড়তি উৎপাদন খরচ, বারবার গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট, এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত-সংক্রান্ত জ্বালানি বাজারের অনিশ্চয়তা, এসব কারণে কর সুবিধা, বিদ্যুৎ-গ্যাসের দাম বা অর্থায়নের মতো অন্য কোনো স্বস্তি ছাড়া মজুরি দ্বিগুণ করার ভার তারা একা বহন করতে পারবেন না।

আপনার জন্য এর মানে কী

এই বিরোধের কেন্দ্রে থাকা প্রায় ৪০ লাখ পোশাকশ্রমিকের জন্য মজুরি বোর্ড গঠন একটা প্রক্রিয়ার শুরু, সমাধান নয়, বাংলাদেশে আগের সংশোধনগুলোতে মালিক, শ্রমিক ও সরকার-নিযুক্ত সদস্যদের মধ্যে মাসের পর মাস আলোচনা লেগেছে নতুন মজুরি গেজেট হতে। যাদের পরিবারের বাজেট পোশাকশিল্পের মজুরির সঙ্গে জড়িত, বা যারা আশুলিয়া, গাজীপুর বা মিরপুরের কারখানায় মালামাল সরবরাহ করে ছোট ব্যবসা চালান, তাদের জন্য নিকট ভবিষ্যতে ঝুঁকিটা হলো বিপর্যয়, কোনো স্থির নতুন মজুরি নয়, নভেম্বর মাস জুড়ে অর্থপ্রদান বা সরবরাহে দেরির সম্ভাবনা মাথায় রেখে পরিকল্পনা করাই ভালো।

সঞ্চয়কারী ও ছোট বিনিয়োগকারীদের জন্য এই ঘটনা মনে করিয়ে দেয়, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি খাতে বারবার শ্রম-খরচ ও জ্বালানি-খরচের ঝুঁকি থাকে, যা সময়ে সময়ে এরকম বিপর্যয়ের রূপ নেয়। অনিশ্চিত এই সময়ে যারা পরিবারের বাজেট সামলাচ্ছেন, নতুন কোনো ঋণ নেওয়ার আগে ওভারটাইম কমে যাওয়া বা বেতনে দেরি হওয়ার মতো পরিস্থিতিতে বিদ্যমান দায় কতটা সামলানো যাবে তা ইএমআই ক্যালকুলেটর দিয়ে আগে থেকে দেখে নেওয়া কাজে দিতে পারে।

এরপর কী

নিকট ভবিষ্যতের পরীক্ষা হলো, রোববারের গেজেট বিজ্ঞপ্তি আশুলিয়ার কারখানাগুলোকে আর কোনো সংঘর্ষ ছাড়া কাজে ফেরাতে পারে কিনা। গভীরতর পরীক্ষা হলো, গঠিত হওয়ার পর মজুরি বোর্ড ১২,৫০০ টাকা আর শ্রমিকদের দাবি করা ৩০,০০০ টাকার মধ্যে যে ফারাক, তার অনেকটা পুরিয়ে এমন একটা অঙ্কে একমত হতে পারে কিনা, এবং সেটা এত দ্রুত করতে পারে কিনা যাতে দীর্ঘায়িত, ধর্মঘটপ্রবণ মজুরি রাউন্ড যে ধরনের ক্রেতা-আস্থার ক্ষয় ঘটাতে পারে তা এড়ানো যায়। বাংলাদেশ এই চক্রের মধ্য দিয়ে আগেও গেছে, সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে ২০২৩ সালের কথা, এবারের বিরোধ কত দ্রুত মিটবে তার ওপর নির্ভর করবে আগামী বছরের সোর্সিং সিদ্ধান্তও।

মন্তব্য

    এখনো কোনো মন্তব্য নেই — প্রথম মন্তব্যটি করুন।

মন্তব্য করতে সাইন ইন করুন

এরপর পড়ুন

জাহাজ ভাড়া তিনগুণ আর কোল্ড চেইনের ঘাটতিতে ৭৬ শতাংশ কমল বাংলাদেশের ফল রপ্তানি

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে বাংলাদেশের ফল রপ্তানি আয় আগের বছরের তুলনায় ৭৬ শতাংশ কমে ৩০.৮৬ মিলিয়ন ডলার থেকে নেমে এসেছে মাত্র ৭.৩৮ মিলিয়ন ডলারে। রপ্তানিকারকরা এর জন্য দায়ী করছেন হরমুজ প্রণালীর কাছে বিপর্যয়ের পর বেড়ে যাওয়া জাহাজ ভাড়া এবং কোল্ড স্টোরেজ, ট্রেসেবিলিটি ও ল্যাব টেস্টিংয়ের দীর্ঘদিনের ঘাটতিকে। গত বছর কম বিমান ভাড়ার সুবাদে ফল রপ্তানি রেকর্ড গড়েছিল, তার তুলনায় এই পতন একটি বড় ধাক্কা। ইউরোপ, যুক্তরাজ্য ও মধ্যপ্রাচ্যে আম, কাঁঠাল, ডাব ও বাঁধাকপির চালান সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

মেরিন কার্গো বিমা বিক্রিতে গ্রিন ডেল্টা ও বিজিআইসিকে তিন মাসের জন্য স্থগিত করল আইডিআরএ

বাংলাদেশের বিমা নিয়ন্ত্রক আইডিআরএ গ্রিন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স ও বিজিআইসিকে তিন মাসের জন্য মেরিন কার্গো বিমা বিক্রি থেকে স্থগিত করেছে, অভিযোগ এনেছে তারা গোপনে একটি বাধ্যতামূলক ট্যারিফ হার থেকে কম প্রিমিয়াম নিয়েছে, যে হারকে বছরের পর বছর ধরে সমালোচকরা অতিরিক্ত ব্যয়বহুল বলে আসছেন।

প্রতিবাদে একজনের মৃত্যু ও ব্যাপক গ্রেপ্তারের মধ্যে বাংলাদেশের মজুরি বোর্ড জানুয়ারিতে বেতন বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি দিল

বাংলাদেশের নতুন নূন্যতম মজুরি বোর্ড বলছে, পোশাক শ্রমিকরা বাড়তি বেতন পাবেন কেবল জানুয়ারি থেকে, যদিও একজন শ্রমিকের মৃত্যু এবং সন্ত্রাসবিরোধী আইনে ব্যাপক মামলা সপ্তাহজুড়ে কারখানা অস্থিরতাকে আরও কঠিন করে তুলেছে। গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও সাভারে বিক্ষোভ পঞ্চম দিনে গড়ায়, এরপর শুক্রবার নাগাদ গাজীপুরের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কারখানা আবার খোলে। কর্তৃপক্ষের স্বাভাবিক পরিস্থিতির দাবি আর শ্রমিকদের নিজস্ব ভয়ের অভিজ্ঞতার মধ্যেকার ফারাক বলছে এই বিরোধ এখনও মেটেনি, যার প্রভাব পড়ছে রপ্তানি সময়সূচি ও পারিবারিক বাজেট দুটোতেই।